মো. আবদুল মজিদ মোল্লা জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার আগে কোনো নবীকে দান করা হয়নি। তা হলো—এক. আমাকে এমন প্রখর ব্যক্তিত্ব (বা প্রভাব) দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে এক মাস দূরত্বেও যা প্রতিফলিত হয়, দুই. আমার জন্য জমিনকে পবিত্র করা হয়েছে ও নামাজের স্থান বানানো হয়েছে। সুতরাং আমার উম্মতের যেখানেই নামাজের সময় হবে, সেখানেই নামাজ পড়তে পারবে, তিন. আমার জন্য গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হালাল করা হয়েছে, যা আমার আগে কারো জন্য হালাল ছিল না, চার. আমাকে (ব্যাপক) সুপারিশের অধিকার দেওয়া হয়েছে, পাঁচ. আগের সব নবীকে তাঁদের স্বজাতি ও গোত্রের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৩৮)
আলোচ্য হাদিসে সমগ্র মানবজাতির ওপর মহানবী (সা.)-এর সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনা এবং অন্যান্য নবী-রাসুলের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক বিশেষ পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সব নবী-রাসুলের প্রতি মুমিনের সাধারণ বিশ্বাস হলো, তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর দ্বিনের ব্যাপারে সত্যবাদী, তাঁরা আল্লাহর মনোনীত ও প্রেরিত পুরুষ, তাঁদের শিক্ষা ও আহ্বানের অনুসরণই মানবজাতিকে মুক্তি দিতে পারে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকেই আল্লাহ সৎ পথে পরিচালিত করেছেন। ফলে আপনি তাদের পথের অনুসরণ করেন।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯০)
পাঁচ বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য
উল্লিখিত আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, মহানবী (সা.) ছিলেন পূর্ববর্তী নবী-রাসুল (আ.)-এর সব কল্যাণ ও পূর্ণতার ধারক। এ জন্য আল্লাহ তাঁকে এমন বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যা একদিকে যেমন তাঁর জন্য মর্যাদাকর, অন্যদিকে তাঁর উম্মতের জন্য তা কল্যাণকর। হাদিসবিশারদরা মহানবী (সা.)-এর পাঁচ বৈশিষ্ট্যের তাৎপর্য হিসেবে যা উল্লেখ করেন, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
মহানবী (সা.)-এর প্রখর ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব : তিনি এমন প্রভাব দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, যার ফলে ইসলামের শত্রুরা মহানবী (সা.)-এর মুখোমুখি না হয়েও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি অবিশ্বাসীদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করব, যেহেতু তারা আল্লাহর সঙ্গে শরিক করেছে, যার স্বপক্ষে আল্লাহ কোনো সনদ পাঠাননি।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫১)
বিপরীতে আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে মুমিন হৃদয়কে প্রশান্ত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করল। তাদের অন্তরে যা ছিল তিনি তা অবগত ছিলেন। তাদের তিনি দান করলেন প্রশান্তি এবং তাদের পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়।’ (সুরা : ফাতাহ, আয়াত : ১৮)
সর্বত্র ইবাদতের অনুমতি
আল্লাহ মহানবী (সা.)-এর সম্মানে তাঁর উম্মতের জন্য পৃথিবীর সর্বত্র নামাজ আদায়ের অনুমতি দিয়েছেন। তাদের জন্য বিশেষ স্থান বা স্থাপনার শর্ত করেননি। শরিয়তের বিধান হলো নামাজের সময় হলে মুমিন শরিয়তে নিষিদ্ধ স্থানগুলো ছাড়া সাধারণভাবে সর্বত্রই নামাজ আদায় করতে পারবে। যেমন—হাদিসে কবরস্থান, গোসলখানা ও উটের আস্তাবলে নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
মাটি পবিত্র করার আরেকটি অর্থ হলো, পানি না থাকলে বা পানি ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে মাটি দ্বারা পবিত্র অর্জন বা তায়াম্মুম করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম কোরো; তা দিয়ে তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও দুই হাত মাসাহ কোরো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৬)
যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বৈধতা
আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদিকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভোগ করা বৈধ করেছেন। যাতে তাদের জীবন-জীবিকায় প্রশস্তি আসে। পূর্ববর্তী উম্মতের জন্য এটা বৈধ ছিল না। তবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভোগের কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সওয়াব বা প্রতিদান মোটেই কমবে না।
সুপারিশের অধিকার
এখানে শাফায়াত বা সুপারিশের অর্থ হলো বৃহত্তর সুপারিশ—যা করতে বড় বড় রাসুলরাও অপারগতা প্রকাশ করবেন। নতুবা সব নবী-রাসুল ও মুমিনদের বিশেষ শ্রেণিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন সুপারিশের অধিকার দেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামত দিবসে সমগ্র সৃষ্টির জন্য সুপারিশ করবেন এবং এ কাজের মাধ্যমে তিনি প্রতিশ্রুত ‘মাকামে মাহমুদ’ (সম্মানিত স্থান) অর্জন করবেন। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীর জন্য বিশেষ একটি দোয়ার অধিকার আছে, যা কবুল করা হবে। প্রত্যেক নবীই তাঁর দোয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন (দুনিয়াতেই তা চেয়েছেন)। আর আমি আমার সে দোয়া কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য মুলতবি রেখেছি। আমার উম্মতের যে ব্যক্তি শিরক না করে মারা যাবে, ইনশাআল্লাহ! সে তা লাভ করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩০৪)
সমগ্র মানবজাতির নবী
মহানবী (সা.) কিয়ামত পর্যন্ত আগত সব মানুষের নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে তাঁকে সর্বশেষ ও সমগ্র মানবজাতির নবী বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তা জানে না।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ২৮)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন। তিনি আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে অবগত।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪০)
লেখক : সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
bdview24.com- Bangla News Portal from Bangladesh. Bangla News from Bangladesh regarding politics, business, lifestyle, culture, sports, crime. bdview24 send you all Bangla News through the day.