যুগে যুগে সিলেট

রাজনৈতিক অঙ্গনে যুগে যুগে সিলেট

আবদুল হামিদ মানিক
খেলাফত আন্দোলন খেলাফত আন্দোলন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে একটি মাইলফলক। ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দে সৈয়দ হাদি ও সৈয়দ মেহেদীর নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধের পর বৃটিশ বিরোধিতায় সুসংগঠিত খেলাফত আন্দোলন সিলেটের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তৃণমূল পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছিল। মহিলারাও খেলাফত আন্দোলনের ডাকে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তবে এর আগে বৃটিশ বিরোধী বিচ্ছিন্ন অনেক প্রতিরোধ প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় সিলেটে। এর মধ্যে সবগুলোই হয়তো মূলত বৃটিশ শাসন ও এদেশের স্বাধীনতা হরণের প্রতিবাদী চেতনায় সংঘটিত হয়নি। নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি রক্ষার উদ্দেশ্যও ছিল। কিন্তু এর পরও প্রবল প্রতাপশালী বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে এসব ঘটনা এ অঞ্চলের জনমনে বিদেশী শাসকদের প্রতি ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল।

১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দে খাসিয়া বিদ্রোহ, ১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দে রাধারামের বিদ্রোহ, ১৭৮৮ খ্রীষ্টাব্দে গঙ্গা সিংহের বিদ্রোহ প্রভৃতি এ অঞ্চলের জনগণকে নাড়া দেয়। খেলাফত আন্দোলনের আগে সমগ্র উপমহাদেশে ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সিপাহী বিপ্লব ছিল বৃটিশ শাসকদের জন্য প্রচন্ড এক ঝাঁকুনি। এ সময় সিলেটের কালেক্টার ছিলেন আর, ও, হেইড। চট্টগ্রামের বিদ্রোহীরা কুমিল্লা হয়ে আসেন সিলেটে। তারা পৃথ্বিম পাশার জমিদার গৌছ আলী খাঁর কাছ থেকে রসদ সংগ্রহ করেন। সিলেট থেকে মেজর বিং সৈন্য নিয়ে বিপ্লবীদের দমন করতে ছুটে যান। পথে লাতু বাজারের পাশে ১৮৫৭ এর ১৯ ডিসেম্বর উভয় পক্ষে মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। এতে মেজর বিং এবং তার সঙ্গী পাঁচ জন সৈন্য বিপ্লবীদের হাতে নিহত হন। এর পর পর ইংরেজ বাহিনীর ভারতীয় সুবেদার অযোধ্যা সিংহ নেতৃত্ব গ্রহণ করলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। বিপ্লবীদের ছাবিবশ জন সৈন্য শহীদ হন। বিপ্লবী বাহিনী লাশ ফেলে কাছাড়ের দিকে চলে যায়। এ যুদ্ধ লাতুর লড়াই নামে খ্যাত। লাতু বর্তমানে বড়লেখা উপজেলার অন্তর্গত। উল্লেখ্য অকুস্থল থেকে ছয়জন বিপ্লবীকে ধরে এনে সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্কে গাছে ঝুলিয়ে প্রকাশ্য ফাঁসি দেয়া হয়। গোবিন্দ চরণ পার্ক এখন হাসান মার্কেট।

সর্বভারতীয় বৃটিশ বিরোধী চেতনায় সিলেটে আগা মোহাম্মদ রেজা বেগের নেতৃত্বে সংঘটিত ফকির ও কৃষক বিদ্রোহ ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। ফকির ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল সমগ্র বাংলায় বৃটিশ বিরোধিতার এক চমকপ্রদ নজীর। এরই ঢেউ আসে সিলেটে। রেজা ছিলেন মোগলদের বংশধর। তার শিষ্য ছিল অনেক। বৃটিশ শাসনকে তিনি শয়তানের রাজত্ব হিসেবে চিহ্নিত করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে তুলেন। কৃষক ও ফকিরদের সংগঠিত করেন। প্রথমে তিনি কাছাড়ের রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। পরে প্রায় বারো শত সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে সিলেট আসেন। কোম্পানির বদরপুর দুর্গ আক্রমণ করেন। ১৭৯৯ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ জুলাই তিনি সিলেটে প্রবেশ করেন। বুন্দাশীলে বৃটিশ সৈন্যদের সাথে তার মোকাবিলা হয়। ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হলে সুবেদার কল্যাণ সিংহকে পাঠানো হয়। আগা মোহাম্মদ রেজা ধৃত হন। বিচারে তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। সিলেট অঞ্চলে এ ধরনের খন্ড খন্ড সংঘাত সংঘর্ষে তৃণমূল পর্যায়ে বৃটিশ বিরোধী চেতনা প্রসারিত হতে থাকে। দিন দিন রাজনৈতিক প্রতিরোধের মনোভাব চাঙ্গা হয়। এভাবে এগিয়ে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সংঘটিত এ যুদ্ধে তুরস্কের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। এই সময় তুরস্কের খেলাফত এবং খলিফাকে মুসলিম জাহানের ঐক্যের প্রতীক গণ্য করা হতো। তুরস্কের বিপর্যয়ের জন্য বৃটিশ সরকারকে মুসলমানরা দায়ী করেন। এতে ইংরেজ বিরোধী চেতনা আরো জোরালো হতে থাকে।

ওয়াজ মাহফিলে, সভা সমাবেশে, খোতবায় ইংরেজ বিরোধী প্রচারণা শুরু হয়। অমনিতেই আলেম উলামারা খ্রীষ্টান ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে ছিলেন। তুরস্কের সাথে একাত্মতা অনুভব করতেন মুসলিম জাতীয়তাবোধ থেকে। এই চেতনা ধারণ করে গড়ে ওঠে খেলাফত আন্দোলন। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বঙ্গভঙ্গ বোধ হয় ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে। এতেও মুসলমান জনগোষ্ঠীর মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইটালী ঐ যুদ্ধে ছিল একপক্ষে। অপর পক্ষে ছিল জার্মানী, অস্ট্রিয়া ও তুরস্ক। যুদ্ধ শেষে তুরস্কের বিপর্যয়ের জন্য ইংরেজদের প্রতি মুসলমানদের ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মহাত্মাগান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন এবং খেলাফত আন্দোলন এক যোগে এক লক্ষ্যে এসে যুক্ত হয়।

১৯২০-২২ খ্রীষ্টাব্দে তুমুল আকার ধারণ করে। ১৯২০ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে সুরমা উপত্যকার রাষ্ট্রীয় সমিতির পঞ্চম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মৌলভী আব্দুল করিম বি এ’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে মাওলানা আকরম খাঁ, বিপিন চন্দ্র পাল, ড. সুন্দরীমোহন দাস প্রমুখ বক্তৃতা করেন। এতে অসহযোগ প্রস্তাব গৃহীত হয়।

১৯২১ খ্রীষ্টাব্দে মৌলভীবাজারে যোগীডহরে অনুষ্ঠিত হয় আসাম প্রাদেশিক খেলাফত কনফারেন্স। দেশবন্ধু সিআর দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ কনফারেন্সে বৃটিশ রাজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই বছরে সিলেটের শাহী ঈদগাহে বিরাট জনসভা হয়। মহাত্মাগান্ধী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী প্রমুখ সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। খেলাফত আন্দোলনে মহিলারাও সজাগ হয়ে উঠেছিলেন। ঐ সময়ে মহিলারা ছিলেন পর্দানশীল, সমাজ ছিল রক্ষণশীল। তা সত্ত্বেও খেলাফত আন্দোলনের তহবিলে মহিলাদের অনেকে তাদের অলংকার পর্যন্ত দান করেন।

আলেম উলেমার অংশগ্রহণের ফলে বৃটিশ বিরোধিতা একটি ধর্মীয় কর্তব্য বলে গণ্য হয়ে ওঠে। খেলাফত আন্দোলনের কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য চারাদিঘীর পার মানিকপীর রোডে খেলাফত আন্দোলন অফিস স্থাপন করা হয়েছিল। এটাকে অলিখিতভাবে খেলাফত বিল্ডিং বলা হতো। ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দের ৪ঠা মে সম্পাদিত একটি কবুলতনামা থেকে জানা যায় মানিকপীর রোড নিবাসী নকি মিয়া, আব্দুল মজিদ, সোনা বিবি, মোঃ সুলতান, আব্দুল আজিজ, হাসিবা বানু, আসিবা বানু ও আব্দুর রহমান আঞ্জুমানে ইসলামিয়ার নামে প্রায় দু’ কেদার ভূমি দান করেন। আব্দুল্লা বি এল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এখানে যে দালান নির্মাণ করেন, খেলাফত আন্দোলনের প্রয়োজনে তাকে ব্যবহার করা হয়। এ বিল্ডিং খেলাফত বিল্ডিং নামে সিলেটে পরিচিতি লাভ করে। এই উত্তাল সময়ে গ্রামগঞ্জেও ধ্বনিত হত ‘জাগো জাগো মুসলমান হাতে লওরে জয় নিশান। দ্বীনের কাজে হওরে আগোয়ান।’ সিলেটবাসী আলেম উলেমা ও নেতৃবৃন্দ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে জেল-জুলুম সহ্য করেন। আন্দোলনে যোগদান ও কারাবরণকারীদের সংখ্যা অনেক।

এর মধ্যে কয়েকজন কৃতি ব্যক্তির নামঃ
সিলেটঃ আব্দুল মতিন চৌধুরী, মাওলানা সখাওতুল আম্বিয়া, মাওলানা আব্দুল মুছবিবর (বালাগঞ্জ), আব্দুল্লা বি এল, ইব্রাহীম চতুলী, আব্দুল হামিদ বি এল, (প্রাক্তন মন্ত্রী), ডাক্তার মর্তুজা চৌধুরী, মাওলানা আব্দুল হক চৌধুরী, আব্দুল হামিদ চৌধুরী (সোনা মিয়া), মৌলভী রিয়াজ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী (জকিগঞ্জ, বারহাল, মাইজগ্রাম, সিলেট খেলাফত কমিটির ছাত্র সংগঠনের অর্গানাইজিং সেক্রেটারী ছিলেন, সখাওতুল আম্বিয়া ছিলেন সেক্রেটারী), মাওলানা আব্দুল হক, মাওলানা আনজব আলী, মাওলানা আবু সাঈদ (চুড়খাই), জাহেদ উদ্দিন আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী, আব্দুল ওয়ারেছ চৌধুরী মাওলানা আব্দুল বারী, (ঝিঙ্গাবাড়ী), খলিলুর রহমান (বিশ্বনাথ), মাওলানা ইব্রাহিম আলী (বিশ্বনাথ/ভার্থখলা), খোন্দকার সিকন্দর আলী (জৈন্তা), মাওলানা ইব্রাহিম তশনা প্রমুখ।

সুনামগঞ্জঃ ফজলুল হক সেলবরষী, দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ, মকবুল হোসেন চৌধুরী, দেওয়ান মুহম্মদ আহবাব চৌধুরী, আসাফুর রেজা চৌধুরী, মাওলানা সাইয়িদ জামিলুল হক, মাওলানা আব্দুল মুকিত চৌধুরী, মাওলানা আব্দুল খালিক, মাওলানা শোয়াইবুর রহমান প্রমুখ।

হবিগঞ্জঃ কাজী গোলাম রহমান, মাওলানা দেওয়ান মুজিবুর রহমান, নুরুল হোসেন খান, মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ বানিয়াচঙ্গী, মাওলানা রিদওয়ান উদ্দিন, ডাক্তার মোহাম্মদ ইলিয়াস, ডাঃ সৈয়দ আব্দুস শহীদ, ডাঃ আলী আসগর নূরী, মাওলানা রেদওয়ান উদ্দীন আহমদ, মাষ্টার হাতিম উল্লাহ খান, সৈয়দ গোলাম আকবর, এহিয়া খান চৌধুরী, মৌলভী মজিদ বখত চৌধুরী প্রমুখ।

মৌলভীবাজারঃ মাওলানা সৈয়দ নজীর উদ্দিন আহমদ, মাওলানা আব্দুল কাদির, মাওলানা আব্দুর রহমান সিংকাপনী প্রমুখ বৃহত্তর সিলেটের সচেতন শিক্ষিত প্রায় সবাই এ আন্দোলনে কমবেশি ভূমিকা রাখেন। খেলাফত আন্দোলনের ঢেউ যখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে তখন সিলেটের আরো দুটি ঘটনা সিলেটের বাইরেও প্রভাব ফেলেছিল। এ ঘটনা দুটি কানাইঘাটের লড়াই এবং মাইজভাগের ছিন্ন কোরান ঘটনা নামে পরিচিত।