prophet muhammad calligraphy
prophet muhammad calligraphy

রাসুলের ﷺ ফুফু সাফিয়্যাহ বিনতে আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহা

নাবিলা আফরোজ জান্নাত
যাকে নিয়ে লিখবো, তাঁর পরিচয়টা দেই। সাফিয়্যাহ বিনতে আব্দুল মুত্তালিব, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু, একজন হাশেমী, একজন কুরাইশী। আমার কাছে তার বড় পরিচয় অবশ্য এভাবে- প্রথম মুসলিম নারী, যিনি আল্লাহর দ্বীন বাঁচানোর জন্য একজন মুশরিককে হত্যা করেছিলেন।

বলে রাখা ভালো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন স্ত্রীর নামও ছিলো সাফিয়্যাহ, সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহা।

সাফিয়্যাহ বিনতে আব্দুল মুত্তালিবের দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন আল আউওয়াম ইবনে খুওয়াইলিদ। আল আউওয়াম আবার ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু আনহার ভাই।

হিজিবিজি লাগছে?

তাঁর আরো আরো পরিচয় আছে।

আচ্ছা আমরা বরং তাঁর জীবনে যাই। আল আউওয়াম মারা গিয়েছিলেন ছোট্টো একটা ছেলেকে রেখে, যুবায়ের। যুবায়েরকে সাফিয়্যাহ বড় করেন খুব যত্নে। এই যত্ন দুই ঘণ্টা ধরে খাবার নিয়ে ছেলের পিছু পিছু দৌড়ানোর যত্ন না। এই যত্ন ছিলো যুবায়েরকে একজন শক্তিশালী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যত্ন। ছোট্টোবেলা থেকে যুবায়েরকে তিনি দেন যোদ্ধার জীবন; ঘোড়ায় চড়া, বর্শা মারা এসবের সাথে পরিচয় করান। তাঁর যত্ন এখনকার মায়েদের যত্ন ছিলো না, যারা সন্তানকে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে আগলে রাখেন। তিনি উলটো যুবায়েরকে ঠেলে দিতেন বিপদের মুখে, ছেলে যাতে ওসব অতিক্রম করতে শেখে, শক্তিশালী হয়।

মাঝে মাঝে খুব মারতেনও, যদি ছেলে ভয় পেতো, সামনে আগাতে না চাইতো। তাই দেখে ছেলের চাচারা বলতো, এটা মায়ের শাসনই না, রাগী মানুষের মতো মারছো ছেলেকে।

সাফিয়্যাহ তীব্র প্রতিবাদ করতেন, আমি রাগী না, আমি ছেলেকে শক্ত-সমর্থ করে গড়ে তুলছি, যাতে সে রক্ষা করতে শেখে, শত্রুকে হারাতে শেখে।

এই যুবায়ের পরবর্তীতে হয়েছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহরক্ষী, যুবায়ের ইবনুল আউওয়াম।

আহ! সম্মান!

ইসলামের প্রথম দিকেই সাফিয়্যাহ ছেলেকে নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন আলোর মিছিলে। হিজরত করে চলে যান মদীনায়।

“হিজরত করে চলে যান মদীনায়”- সহজ, সরল একটা বাক্য। আসেন ভেতরে যাই বাক্যের। একজন নারী, যার জন্ম মক্কার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারে, সম্ভ্রান্ত বংশে; যিনি বেড়ে উঠেছেন এখানে; বিয়ে, সংসার, সন্তান, তার সমস্ত কিছুই এই শহরে। এখানে তিনি অনেক কাজ করেছেন, নিজের গৌরব, কীর্তির জন্য তিনি পরিচিত।

তার প্রায় অনেকটা জীবন কেটেছে মক্কায়।

কতোটা জীবন?

ষাট বছর।

জ্বী, এই বয়সে তিনি সব ছেড়ে নিতান্তই অপরিচিত এক শহরের উদ্দেশ্যে এমন এক দলের সঙ্গে রওনা দিলেন, যারা নির্যাতিত হয়ে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, যাদের শক্তি কম।

কীসের আশায়?

কীসের ভরসায়?

-আল্লাহর।

আল্লাহর নির্দেশে হিজরতে এই যাত্রায় যাত্রীদলের কেউ ভয় পায়নি। আপাতদৃষ্টিতে তাদের শক্তি কম ছিলো, কিন্তু তারা জানতেন তারাই সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী।

উদ্দেশ্য অজানায় ছিলো না, উদ্দেশ্য ছিলো রাব্বে কারীম।

ষাট বছর বয়সে এই সমাজের নারীরা চিকিৎসকের কাছে যান, নানান অসুখে জর্জরিত দেহে। এসি বাসে জার্নি করতেও সবাই পারেন না, দুর্বল। সাফিয়্যাহ প্রচণ্ড গরমে উটের পিঠে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রায় দু’শো আশি মাইল, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্বের প্রায় দ্বিগুন, তা-ও মরুভূমি দিয়ে।

আমরা দুইটি যুদ্ধে তার গল্প জানবো।

উহুদের যুদ্ধ।

সাফিয়্যাহ একদল নারীকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন মুসলিম দলের সাথে। তার দলের কাজ পানি ব্যবস্থাপনা, সাহায্য করা। কেউ মুজাহিদদের পানি খাওয়ায়, কেউ তীরের ফলা তীক্ষ্ণ করে দেয় চেঁছে, কেউ ধনুক মেরামত করে দেয়।

যুদ্ধের ময়দানে তিনি ছিলেন মনোযোগী পর্যবেক্ষক। পুরো পরিস্থিতি তিনি খেয়াল করছেন, প্রিয় ভাতিজা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও চোখে রাখছেন। আর তার ভাই হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে, যাকে বলা হয় আসাদুল্লাহ, আল্লাহর সিংহ।

যে ছেলেকে গড়ে তুলেছিলেন যোদ্ধা হিসেবে, যুবায়ের, সে-ও ছিলো উহুদের ময়দানে।

আমরা এই গল্পগুলো খুব সহজ করে বলে যাই, পড়ে যাই।

নিজেকে একবার ঐ জায়গায় ভাবি, মুখোমুখি যুদ্ধ হচ্ছে, হাতে হাতে খোলা তলোয়ার, লাশ, রক্ত, প্রচণ্ড হুংকার, আওয়াজ- এরকম চরম অবস্থায় একজন নারী। আমরা রাস্তায় চলাফেরার সময় গাড়ির টায়ার ফাটলেও চমকে উঠি, ঘরের মধ্যে থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ চমকালে ভয়ে কাঁপি। আমাদের প্রিয়জনের মাথাব্যথা, জ্বর কিংবা সামান্য হাত-পা কেটে গেলে কতো যত্ন করি।

সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহার, ছেলে, ভাই, ভাতিজা সেই যুদ্ধের ময়দানে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে দেখা গেলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আশপাশে অনেকেই বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। মুশরিকরা কাছাকাছি চলে এসেছে।

এই দেখে সাফিয়্যাহ লাফিয়ে উঠলেন, হাতে ছিলো পানির পাত্র, ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একজন সৈনিকের হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিলেন। তারপর ছুটলেন সেনাসারির মাঝখান দিয়ে, অন্যদের তিরস্কার করতে করতে,

“কাপুরুষের দল, রাসুলুল্লাহকে ফেলে তোমরা নিজের জান বাঁচাতে ছুটছো!”

পরিস্থিতিটা কল্পনা করুন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখলেন এভাবে এগিয়ে আসতে। ওদিকে কিছুক্ষণ আগে হামজা রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হয়েছেন। তার লাশকে বিকৃত করে ফেলেছে মুশরিকরা। রাসুলের ﷺ আশঙ্কা হলো, এই লাশ তিনি দেখে ফেলেন কি না। যুবাইরকে বললেন, তোমার মা’কে থামাও। তাড়াতাড়ি।

যুবাইর এগিয়ে গেলেন। মা’কে থামাতে। রাসুলের ﷺ আদেশ।

সাফিয়্যাহ ধমক দিলেন, আমি জানি আমার ভাইয়ের লাশের অবস্থা। এই কুরবানি শুধুই আল্লাহর জন্য।

শুনে রাসুল ﷺ যুবাইরকে বললেন, তাকে যেতে দাও।

যুদ্ধশেষে তিনি ভাইয়ের জন্য মাগফেরাতের দু’আ করলেন। বললেন, আল্লাহর জন্য সবকিছু। আমি এ ফয়সালায় সন্তুষ্ট। আল্লাহর জন্য সবর। আল্লাহ এর উত্তম প্রতিদান দিবেন।

ও জায়গাটায় নিজেকে ভাবি।

তার সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি খন্দকের যুদ্ধের।

কোনো যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারী ও শিশুদের সুরক্ষিত রেখে যেতেন, কোনো দুর্গে। কারন মুসলিম পুরুষরা যুদ্ধের ময়দানে চলে গেলে তাদের অবর্তমানে নারী ও শিশুদের উপর আক্রমণ হতে পারে।

খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের স্ত্রী, ফুফু, অন্য মুসলিমদের স্ত্রীগণকে হাসসান ইবনে সাবিতের দুর্গে রেখে গেলেন। ঐ সময় ওটাই ছিলো মদীনার সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গ।

যুদ্ধে মুসলিমরা যখন মুশরিকদের কাছাকাছি, ঐ সুযোগে এক ইহুদি দুর্গের দিকে এগিয়ে গেলো, সে গুপ্তচর। খোঁজ নিতে এসেছে কেউ আছে কি না দুর্গের পাহারায়, ভেতরে কারা আছে।

সময়টা ফজরের।

আবছা অন্ধকারে সাফিয়্যাহ’র সতর্ক চোখ এই ইহুদিকে এড়িয়ে গেলো না। তিনি দেখেই বুঝে ফেললেন, এ তো এখানে গুপ্তচরবৃত্তি করতে এসেছে! নিশ্চয়ই বনু কুরাইযার কেউ। এখন যদি কেউ আক্রমণ করে, তাহলে ঠেকানোর জন্য কোনো পুরুষ নেই।

বনু কুরাইযার ইহুদিদের সাথে মুসলিমদের মিত্র চুক্তি ছিলো। সেই চুক্তি ভেঙে তারা মুশরিকদের সাহায্য করতে চাইছিলো।

এমন পরিস্থিতিতে দুর্গে আক্রমণ হলে নারীদের ওরা বন্দি করবে, বাচ্চাগুলোকে ক্রীতদাস-দাসী বানাবে।

সাফিয়্যাহ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। ওরনা খুলে মাথায় বাঁধলেন। কোমরে শক্ত করে বাঁধা গামছা, হাতে বড় একটা লোহার দন্ড। এগিয়ে গেলেন দুর্গের প্রধান দরজার দিকে, ছোটো একটা ফুটো করে নজর রাখছেন গুপ্তচরটির উপর।

ফজরের অন্ধকারে সাহসিনী।

গুপ্তচর ইহুদিটা কাছাকাছি আসতেই সুযোগমতো হামলা করে বসলেন। লোহার দন্ড দিয়ে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে মাথায় আঘাত।

অতর্কিত হামলার জন্য ইহুদিটি প্রস্তুত ছিলো না। থাকার কথাও না। সে মাটিতে পড়ে গেলো। আরো ক’বার আঘাত করে ওটাকে পাঠিয়ে দিলেন ওপাড়ে।

উহু, ঘটনা শেষ হয়নি।

সাফিয়্যাহ এখানে শেষ করতে পারতেন। কিন্তু তার পরিকল্পনা তো শত্রুপক্ষের কাছে এইরকম বার্তা দেওয়া যে এখানে সতর্ক পাহারা আছে, আক্রমণ করা যাবে না।

তিনি কী করলেন জানেন?

ঐ ইহুদির লাশ থেকে মাথাটা আলাদা করে ফেললেন।

আমরা যারা গরু জবাই দেখতে পারি না, তারা একটু ভাবি। রক্ত দেখলে যাদের মাথা ঘুরায়, তারাও ভাবি।

কাটা মাথাটা উঠিয়ে দুর্গের উঁচু জায়গা থেকে ফেলে দিলেন। ঢাল গড়িয়ে গড়িয়ে একটা কাটা মাথা গিয়ে পড়লো অপেক্ষারত অন্য ইহুদিদের সামনে, যারা অপেক্ষায় ছিলো দুর্গে আক্রমণের।

খবরের পরিবর্তে কাটা মাথা আসতে দেখে তাদের হিসাব মিটে গেছে। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে করতে চলে গেলো, মুহাম্মদ দুর্গ নিরাপদ রেখেই গেছে।

আমরা সাহাবিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহাদের গল্পগুলো শুধু পড়ি, কখনো কখনো ইবাদতগুলো অনুসরণ করি। কিন্তু তাদের যে অসীম সাহস ছিলো, তারা একেকজন যে ছিলেন “স্ট্রং মুসলিমাহ”, সে ভাবনাটা কেন যেন ভাবা হয় না। অথবা এই জন্য ভাবা হয় না যে, তারা তো যুদ্ধের ময়দানে সাহস দেখিয়েছেন। আমরা কোথায় সাহসের চর্চা করবো?

আয়নার সামনে ব্যয় করা সময়ের খানিকটা শরীরচর্চায় দিলে আল্লাহর ইবাদতেও শরীরের জোর থাকবে। বয়স বাড়লে বসে সলাত আদায়ের মাস’আলা খুঁজতে হবে না। অথবা এক দুই সন্তানের মা হয়েই বুড়িয়ে যেতে হবে না। আমরা তো শীতের ফজরে ঠান্ডা পানিতেই কাবু।

আর মানসিক শক্তি, এর জন্য মোটিভেশনাল বই প্রয়োজন হতো না যদি আমরা পেছন ফিরে তাকাই। প্রিয়জন ফোন না ধরলে কান্নাকাটি করে একাকার করে ফেলা এই আমাদের ভীষণ দৃঢ় হতে হবে। আল্লাহর জন্য ভাই, সন্তান, আদরের ভাতিজা, ভাগনে উৎসর্গ করে দেবার মতো দৃঢ়।

আমি একজনের ব্যাপারে জেনেছিলাম, সে বোরকায় পা জড়িয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছে। মাথায় খুব আঘাত, ব্রেইন হ্যামারেজ হয়ে আইসিইউ এ ভর্তি। তার জন্য দো’আ চাওয়া হচ্ছিলো। হতে পারে ওটা নিছক দুর্ঘটনা। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুক এমন পরিস্থিতি থেকে।

কিন্তু ভবিষ্যতের সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মা হবেন যারা, তাদের এমন হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে চলবে না। অনেক বেশী সতর্ক হওয়া দরকার।

আমাদের আল-আকসা উদ্ধার করতে হবে, আমাদের অনেক শক্তিশালী মুসলিম তৈরী করতে হবে।

অনেক কাজ বাকী।

আমাদের একেকজনের রৌদ্রময়ী হওয়া দরকার, আলোর মিছিলে আলোকবর্তিকা হওয়া দরকার।