সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে হজরত আলী রা:-এর শাহাদতের পর উমাইয়া খিলাফতের গোড়াপত্তন হয়েছিল। সে সময় মুসলমানেরা ব্যাপকভাবে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করে এবং ইউরোপের প্রতাপশালী ও অত্যাচারী শাসক রডারিককে পরাজিত করে স্পেন বিজয় সম্পন্ন করা হয়। প্রজা উৎপীড়ক রডারিক ক্ষমতায় এসেছিলেন শাসক ইউটিজাকে হত্যা করে।
এ সময় সিউটা দ্বীপের শাসক ছিলেন কাউন্ট জুলিয়ান। তিনি কন্যা ফোরিন্ডাকে রাজকীয় রসম-রেওয়াজ, আদবকায়দা শেখাতে রডারিকের কাছে প্রেরণ করেন। কিন্তু রডারিক কর্তৃক ফোরিন্ডার সম্ভ্রমহানির ঘটনা ঘটে। উইটিজা ছিলেন জুলিয়ানের শ্বশুর। তার হত্যা ও কন্যার সম্ভ্রমহানির প্রতিশোধ নিতে জুলিয়ান মুসলিম বীর মূসাকে আমন্ত্রণ জানান স্পেন অভিযানের জন্য।
স্পেনের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা যখন অত্যন্ত শোচনীয়, তখনই মূসাকে স্পেন আক্রমণের আহ্বান জানানো হলো। তদানীন্তন উমাইয়া বংশীয় খলিফা ছিলেন ওয়ালিদ। মূসা খলিফার অনুমতি নিয়ে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে পাঠালেন স্পেন অভিযানের জন্য। মূসা পরে এসে তার সাথে যোগ দেন। সেনাপতি তারিক ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে রডারিকের এক লাখ ২০ হাজার সৈন্যের মোকাবেলায় এগিয়ে যান।
প্রতিপক্ষের সংখ্যাধিক্য সাধারণ সৈন্যদের মনে কিছুটা বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে। তারিক তা উপলব্ধি করে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সব সৈন্যকে সমবেত করে তাদের জাহাজগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি ভাষণে বলেন-‘হে মুজাহিদরা! তোমরা পালাবে কোথায়? তোমাদের পেছনে সাগর, আর সামনে শত্রু। তোমাদের আছে কেবল সাহস আর ধীশক্তি। তোমাদের সামনে শত্রু, যারা অসংখ্য। তাদের বিপরীতে তোমাদের তলোয়ার ছাড়া আর কিছুই নেই। তোমরা বেঁচে থাকতে পারবে যদি শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের জীবনকে ছিনিয়ে আনতে পারো। ভেবো না, আমি তোমাদের সাথে থাকব না। নিজে সবার সামনে থাকব এবং আমার বাঁচার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম।’
সেনাপতি তারিকের এই ভাষণে মুসলিম সেনাবাহিনী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ৭১১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল ‘ওয়াদি লাস্কের’ নামক স্থানে ভিসিগথ বাহিনীর সাথে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। তারিক আরো অগ্রসর হন এবং একের পর এক শহর করায়ত্ত করতে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে বিজিত হয় কর্ডোভা। এভাবেই সমস্ত হিসপানিয়া তথা স্পেন মুসলমানদের হাতে চলে আসে।
তারপর মূসা বিন নুসাইর পিরেনিজ পর্বতে দাঁড়িয়ে সমগ্র ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন আঁকছিলেন; আর স্পেন থেকে বিতাড়িত গথ সম্প্রদায়ের নেতারা পিরেনিজের ওপারে স্পেন পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। তাদের সাথে যুক্ত হন ইউরোপের খ্রিষ্টান নেতারা। মুসলমানেরা পিরেনিজ অতিক্রম করে ফ্রান্সের অনেক এলাকা জয় করেন। কিন্তু তুলুর যুদ্ধে ভয়াবহতার সম্মুখীন হয়ে তারা বুঝতে পারলেন, অসির পরিবর্তে মসির যুদ্ধেই ইউরোপ জয় করা সহজ।
এরপর মুসলমানদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা ও বিস্তারে। তারা সেই যুদ্ধে সফল হন এবং ইতিহাস তাদের বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে। অপর দিকে, খ্রিষ্টীয় শক্তি পুরনো পথ ধরেই হাঁটতে থাকে। ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মে মাসারার যুদ্ধের পর থেকে স্পেনের ওপর তাদের নানামুখী আগ্রাসন ও সন্ত্রাস চলতে থাকে। ফলে স্পেনের নিরাপত্তা হয়ে পড়ে হুমকির সম্মুখীন। কিন্তু স্পেনবাসী জ্ঞান-বিজ্ঞান-আদল-ইনসাফ, সাম্য-সৌহার্দ্য-ভ্রাতৃত্ব, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করেছিল মুসলিম শাসনামলে। তখন স্পেনের রাজধানী ছিল গ্রানাডা এবং অপর প্রধান শহর ছিল কর্ডোভা। গ্রানাডা গড়ে ওঠে মুসলিম সভ্যতার একটি প্রাণকেন্দ্র হিসেবে।
সেখানকার আলহামরা প্রাসাদ ও গ্রান্ড মসজিদ আজো বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়কর ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়। সমগ্র ইউরোপ থেকে দলে দলে শিক্ষার্থীরা আসতেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে। আধুনিককালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা হার্ভার্ড কিংবা অক্সফোর্ডে যান, তখন যেতেন কর্ডোভায়।
স্পেনের প্রতিটি জনপদে গড়ে তোলা হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। দুই সভ্যতার মিলনকেন্দ্র স্পেনে দীর্ঘ মুসলিম শাসনামল ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতি, সভ্যতার চরম উৎকর্ষের কাল এবং ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের লালন ও বিকাশের সময়। এ সময় স্পেনীয় মুসলমানেরা সমগ্র ইউরোপের কাছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির মডেল হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বাস প্রথম আমেরিকা আবিষ্কারের দাবি করলেও স্পেনের মুসলমানেরা তার অনেক আগে থেকেই আমেরিকানদের সাথে ব্যবসাবাণিজ্য করতেন বলে গবেষণায় প্রমাণিত। স্পেনের মুসলিম সভ্যতাকে ইউরোপীয়রা স্বীকৃতি দিয়েছে ‘মরুসভ্যতা’ হিসেবে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকেরা স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য নিয়মিত গোসল করতেও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। অথচ মুসলমানেরা রাস্তায় রাস্তায় গড়ে তুলেছিলেন হাম্মামখানা। সেখানে শুধু অজু-গোসলের ব্যবস্থাই থাকত না, বরং থাকত সুগন্ধি, প্রসাধন ও সাবানের ব্যবস্থা।
স্পেনের পূর্বনাম হিসপানিয়া। মুসলিম বিজয়ের পর নতুন নাম হয় ‘আন্দালুসিয়া’। রাজধানী স্থানান্তরিত হলো কর্ডোভায়। ইউরোপ যখন মূর্খতা, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসে নিমজ্জিত ছিল, সেখানে মুসলমানেরা আন্দালুসিয়ায় ৮০০ শিক্ষাকেন্দ্র, ৭০০ মসজিদ ও ৭০টি লাইব্রেরি স্থাপন করেছিল। লাইব্রেরিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টিতে প্রায় ছয় লাখ গ্রন্থ স্থান পেয়েছিল। এ ছাড়া ৯০০ পাবলিক গোসলখানা, ৬০ হাজার প্রাসাদ এবং বিপুলসংখ্যক রাস্তাঘাট নির্মিত হয় মুসলিম শাসনামলে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মুসলমানদের পদচারণা ছিল বিস্মিত হওয়ার মতো।
মুসলিমদের স্পেন বিজয় ও সভ্যতার বিবর্তন খ্রিষ্টীয় শক্তি স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। বরং তারা শুরু থেকেই মুসলমানদের অগ্রযাত্রা রোধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী মুসলমানেরা যখন অপ্রতিরোধ্য; রোম-পারস্যসহ সব পরাশক্তি যখন মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে, তখনই ইউরোপের খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নতুনভাবে জেগে উঠল ক্রুসেডের চেতনায়।
তারা সমস্ত খ্রিষ্টান রাজন্য ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের কাছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যের ডাক দেয়। এর মূলমন্ত্রই ছিল- মুসলমানদের পরাজিত করে ইসলামের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্রুসেড’ বা ‘ধর্মযুদ্ধ’। সমগ্র ইউরোপে ক্রুসেডের আহ্বানে সাড়া দেয় সম্মিলিত খ্রিষ্টীয় শক্তি। নিজেদের বিভেদ ভুলে তারা মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। চলতে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্রুসেডারদের তাণ্ডব।
ষষ্ঠ ক্রুসেডের সময় পর্যন্ত বারবার প্রতারণার আশ্রয় নেয় খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গ ও ক্রুসেডাররা। ১০৯৫ থেকে দীর্ঘ ১৯৬ বছর পর্যন্ত এসব ক্রুসেডের ফলে বহু নিরীহ মানুষকে জীবন হারাতে হয়। চূড়ান্তভাবে ১২৪৪ সালে জেরুসালেম মুসলমানদের দখলে আসে। ১২৪৪ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত একটানা ৬৭৫ বছর জেরুসালেম মুসলিম শাসনে ছিল। ১৯১৯ সালে ইংরেজ জেনারেল অ্যালেনবাই জেরুসালেম শহরে সদলবলে ঢুকে ক্রুসেডের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
মূলত মুসলিম শাসকদের অদূরদর্শী নেতৃত্ব, জনগণের অসচেতনতা ও অনৈক্যের ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে মুসলিম জাতিকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। এই মাশুলেরই একটি হচ্ছে ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক বিভীষিকা ও দুঃসহ স্মৃতি।
স্পেনে শাসক তখন বাদশাহ হাসান। খ্রিষ্টানরা হাসানের বিরুদ্ধে তার পুত্র আবু আব্দুল্লাহকে বিদ্রোহী করে তোলে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে। পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে পলায়ন করেন এবং আব্দুল্লাহ ক্ষমতা গ্রহণের পরই শুরু হয় স্পেনের মুসলমানদের পতন। তার দুর্বল নেতৃত্ব ও নৈতিক অবস্থান এবং মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণ করে সম্মিলিত খ্রিষ্টশক্তি। আর সে ষড়যন্ত্রকে মজবুত ভিত্তি দিতেই আরগুনের শাসক ফার্দিনান্দ ও কাস্তালিয়ার পর্তুগিজ রানী ইসাবেলা বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
স্পেনে মুসলমানদের পতনের জন্য সম্মিলিত খ্রিষ্টীয় শক্তির ষড়যন্ত্র এবং মুসলিমদের আন্তঃকলহই প্রধানত দায়ী। আর সে ধারাবাহিকতায় ১৪৮৩ সালে আবু আব্দুল্লাহ লুসান আক্রমণ করে পরাজিত ও বন্দী হন। পরে গ্রানাডার গভর্নরের সাথে তার গৃহযুদ্ধ বেধে যায়, যা ছিল ফার্দিনান্দের ষড়যন্ত্র। এভাবে গৃহযুদ্ধের ফলে মুসলমানদের শক্তি কমতে থাকলে খ্রিষ্টান বাহিনী গ্রানাডা অবরোধ করে। তারা প্রতিপক্ষের সাথে একটা আপসরফার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৪৯২ সালে ‘ক্যাপিচুলেশন অব গ্রানাডা’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দালুসিয়ায় মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। মুসলিমদের ধর্মীয়, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক সুবিধাই ছিল এ চুক্তির বিষয়বস্তু।
ফার্দিনান্দ আবু আব্দুল্লাহকে আশ্বস্ত করেন, তারা যদি বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। দুর্বল রাজা ও তার সভাসদরা অতীতের চুক্তিভঙ্গের কথা ভুলে গিয়ে ফার্দিনান্দের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অনেক সাহসী সৈনিক লড়াই করে শাহাদতকে বেছে নিলেও অন্য সবাই গ্লানিকর আত্মসমর্পণের পথ গ্রহণ করে। শুরু হয় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। খ্রিষ্টান সৈন্যরা মুসলমানদের শস্যক্ষেত্র জ্বালিয়ে দেয়। সমৃদ্ধ গ্রামগুলো ধ্বংস করা হয়। ওরা গবাদিপশু তুলে নিয়ে যায়।
ফলে সহজেই ফার্দিনান্দ গ্রানাডার রাজপথসহ পুরো শহর দখল করে নেন ২৪ নভেম্বর, ১৪৯১ সালে। এরপর শুরু হয় নৃশংস ও বর্বর হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ। অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেলে অনেক মুসলিম বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেন। বিদ্রোহী এসব লোককে হত্যা করার পাশাপাশি একপর্যায়ে ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলার বাহিনী ঘোষণা করে, যারা শান্তি চায় তারা যেন সব মসজিদে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
সরল বিশ্বাসে হাজার হাজার মুসলিম আবালবৃদ্ধবনিতা নগরীর মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেন। কিন্তু রাতের আঁধারে জ্বালিয়ে দেয়া হলো সব মসজিদ। আগুনের লেলিহান শিখা, নারী-পুরুষের আর্তনাদ আর ফার্দিনান্দ-ইসাবেলার যুগপৎ অট্টহাসিতে গ্রানাডার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এ ঘটনা ঘটে ১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল। ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রতারণা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও নারকীয় বিয়োগান্ত ঘটনা সংঘটিত হয় সে দিন। হাসি-তামাশাচ্ছলে এই দিনে ‘এপ্রিল ফুল’ তথা ‘এপ্রিলের বোকা’ উদযাপিত হলেও এটি মূলত অবিস্মরণীয় ট্র্যাজেডির দিন।
নির্মম গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, ফার্দিনান্দের ছেলে তৃতীয় ফিলিপ তাদের সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করে। তাদের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখেরও বেশি। তাদের মধ্যে খুব অল্প লোকই জীবিত ছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহিন অতলে হারিয়ে যান চিরদিনের জন্য। এভাবেই মুসলিম আন্দালুসিয়া আধুনিক স্পেনের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের দুঃখ হয়ে বেঁচে আছে।
মূলত ইউরোপে মুসলমানেরা প্রবেশ করেছিলেন স্পেনের দরজা দিয়ে। ঐতিহাসিক রবার্ট ব্রিফল্ট ‘দ্য মেকিং অব হিউম্যানিটি’ গ্রন্থে মুসলমানদের এ প্রবেশকে ‘অন্ধকার কক্ষের দরজা দিয়ে সূর্যের আলোর প্রবেশ’ বলে অভিহিত করেছেন। ব্র্রিফিল্টের বক্তব্য হলো- ‘স্পেনে মুসলমানদের আগমনে শুধু স্পেন নয়, বরং গোটা ইউরোপ মুক্তির পথ পেয়েছিল এজ অব ডার্কনেস তথা হাজার বছরের অন্ধকার থেকে।’ এজ অব ডার্কনেস সম্পর্কে রবার্ট ব্রিফল্টের মন্তব্য- ‘সেই সময় জীবন্ত অবস্থায় মানুষ অমানুষিকতার অধীন ছিল, মৃত্যুর পর অনন্ত নরকবাসের জন্য ছিল নির্ধারিত।’
মুসলিম সেনাপতি তারেকও মূসার বীরত্বগাথায় মুসলমানেরা আন্দালুসিয়া তথা স্পেনে ইসলামের বিজয় নিশান ওড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু খ্রিষ্টবাদী ষড়যন্ত্র, মুসলিমদের অনৈক্য ও শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতার কারণে স্পেন অনেক আগে মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। তবে মুসলমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদি-খ্রিষ্টবাদী ষড়যন্ত্র আজো বন্ধ হয়নি। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে ১ এপ্রিল গ্রানাডা ট্র্যাজেডির ৫০০ বছর উদযাপন উপলক্ষে স্পেনে আড়ম্বরপূর্ণ এক সমাবেশে মিলিত হয়েছিল বিশ্ব খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। সেখানে একচ্ছত্র খ্রিষ্টান বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলিম জাগরণ ঠেকাতে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘হলি মেরি ফান্ড’।
স্পেন হয়ে আছে উম্মাহর শোকের স্মারক। ১ এপ্রিল আসে সেই শোকের মাতম নিয়ে। পাশ্চাত্য ১ এপ্রিল ঐতিহাসিক গ্রানাডা ট্র্যাজেডি দিবসকে ‘April Fool’ তথা ‘এপ্রিলের নির্বোধ’ হিসেবে পালন করে থাকে। এ দেশেও অনেককে এই গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসাতে দেখা যায়, যা আত্মপ্রতারণা ও গ্রানাডা ট্র্যাজেডির শহীদদের সাথে পরিহাস ছাড়া কিছুই নয়। অপরদিকে, আত্মপরিচয় ফিরে পেতেই বিশেষত মুসলমানদের এই অশুভ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
bdview24.com — বিডিভিউ২৪.কম Bangla News from Bangladesh regarding politics, business, lifestyle, culture, sports, crime. bdview24 send you all Bangla News through the day.