মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তরের স্বাধীনতা একটি মহান অর্জন। স্বাধীনতার জন্য তারা কালে কালে যুদ্ধ ও সংগ্রাম করলেও ১৯৭১ সালের আগে স্বদেশ শাসনের উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ বাঙালির হয়ে ওঠেনি। আর বাঙালি মুসলমানের জন্য একাত্তরের স্বাধীনতা ছিল আরো বেশি তাৎপর্যময়। কেননা ১৯৪৭ সালের আগে এক দল ‘তথাকথিত’ বাঙালি ‘ইসলাম ও বাঙালিত্ব’কে যেমন মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল, তেমনি পাকিস্তান আমলে শাসকগোষ্ঠী একই কাজ করেছিল। প্রথম শ্রেণি মুসলিম হওয়ার কারণে ‘বাঙালি মুসলমানে’র বাঙালিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করত আর দ্বিতীয় শ্রেণি বাঙালি হওয়ার দরুন তাদের মুসলমানিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করত। পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যাকে বৈধ করার জন্য ধর্মের নানা অপব্যবহার করে একাত্তরের আগে ও পরে। ‘এটি স্বাধিকার নয়, ইসলামের বিরুদ্ধে কাফিরের যুদ্ধ’ বলে তারা দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রপাগান্ডা চালায়। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘কুমিল্লার নবম ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে আমার সফরকালে আমি দেখেছি, পাঞ্জাবি অফিসাররা বাঙালিদের ইসলামের আনুগত্যের প্রতি সব সময়ই সন্দেহ পোষণ করত। তারা বাঙালি মুসলমানদের কাফির ও হিন্দু বলত।’ (দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ২৪)

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে একশ্রেণির রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী পাকিস্তানি শাসকদের সুরে বলতে থাকে ‘এটি ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্মহীনতা’র লড়াই, যা দেশের সাধারণ মানুষকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের ‘সংশয়’ দূর করে দেন। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফিরেই তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমান; আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’ (আবুল মনসুর আহমদ, আমার-দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, ২০১০, পৃষ্ঠা ৬০৪)

ইতিহাস বলে, বাঙালি জাতির দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে ইসলাম কখনো অন্তরায় ছিল না; বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম হিসেবে তা অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করেছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধ; সর্বত্র বাঙালি মুসলিম তার ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা লাভের চেষ্টা করেছে। বিপরীতে পাকিস্তানি শাসকরা তাদের ধর্মপরায়ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের প্রতিবাদে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য, লেবেলসর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হজরত রসুলে করিম (সা.)-এর ইসলাম; যে ইসলাম জগদ্বাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র।’ (বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, নভেল পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ২১)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে বলা হয় স্বাধীনতার পরোক্ষ ঘোষণা। তেজোদীপ্ত সেই ভাষণে তিনি স্বাধীনতার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে। তিনি বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে কবি আবদুস সালামের কণ্ঠে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে প্রচারিত ঘোষণাটিও (মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বেসামরিক ঘোষণা) শুরু হয়েছিল ইসলামী রীতিতে ‘নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লিয়ালা রাসুলিহীল কারিম’ দিয়ে এবং শেষ হয়েছিল কোরআনের আয়াত ‘নাছরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব’-এর মাধ্যমে। একই দিনে কলকাতা বেতার স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য প্রচারিত হয়। যার পরিসমাপ্তি হয় এভাবে, ‘May Allah bless you and help in your straggle for freedom. JOY BANGLA.’ অর্থাৎ এই মুক্তিসংগ্রামে আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করুন এবং সাহায্য করুন। জয় বাংলা। (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, খণ্ড-৩, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, হাক্কানী পাবলিশার্স, ২০১০, পৃষ্ঠা ১১ ও ২৩২)

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল ১৯৭১ ‘স্বাধীন বাংলার সংগ্রামী জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনাবলি’ শিরোনামের একটি প্রচারণা ছিল এমন—“বাঙালির অপরাধ তারা তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততিদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার দাবি জানিয়েছে। বাঙালির অপরাধ আল্লাহর সৃষ্ট পৃথিবীতে, আল্লাহর নির্দেশমতো সম্মানের সাথে শান্তিতে সুখে বাস করতে চেয়েছে। বাঙালির অপরাধ মহান স্রষ্টার নির্দেশমতো অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে এক সুন্দর ও সুখী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার সংকল্প ঘোষণা করেছে।… আমাদের সহায় পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য। মনে রাখবেন, আপনার এ সংগ্রাম ন্যায়ের সংগ্রাম, সত্যের সংগ্রাম। পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার দুশমন বাঙালি মুসলমান নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা কাউকে হত্যা করতে, বাড়িঘর লুট করতে, জ্বালিয়ে দিতে এতটুকু দ্বিধা করেনি। মসজিদের মিনারে আজান প্রদানকারী মুয়াজ্জিন, মসজিদে-গৃহে নামাজরত মুসল্লি, দরগাহ-মাজারে আশ্রয়প্রার্থী হানাদারের গুলি থেকে বাঁচেনি। এ সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার ওপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন। ‘অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই সুখকর’। বিশ্বাস রাখুন : ‘আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী।’” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৬-১৮)

এ ছাড়া রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করতে গায়েবানা জানাজা, কোরআন তিলাওয়াত, শহীদদের জন্য প্রার্থনা, অস্থায়ী মসজিদ স্থাপন ও ইমাম নিয়োগের প্রশাসনিক নির্দেশের প্রমাণও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিলপত্রে পাওয়া যায়। যেখানে এটাও বলা আছে, ‘This arrangement is required to boost up the moral of the service-man.’ অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে এসব (ইসলাম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের) আয়োজন যোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়েছিল। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১৯)

দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বিজয়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতেও ছিল বিশ্বাসের দ্যুতি। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর ঘোষণায় বলেন, ‘আমি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ দেশবাসীকে আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য ও একটি সুখী, সমৃদ্ধিশালী সমাজ গঠনে আল্লাহর সাহায্য ও নির্দেশ কামনা করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।’ (বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র, খণ্ড-৩, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, হাক্কানী পাবলিশার্স, ২০১০, পৃষ্ঠা ৩১৪)

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার সংযুক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধে ইসলামের অনুপ্রেরণা বিষয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের যে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ঘোষিত হলো তা ইসলামহীন সেক্যুলারিজম নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ইসলামসংক্রান্ত অনুষ্ঠান একটু বেশিই যেন প্রচারিত হতো। হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে বিশেষ কিছুই হতো না। কিন্তু কেন তা হতো? তা হতো এ জন্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান শ্রোতার কাছে ইসলামী অনুষ্ঠানের বিশেষ আবেদন ছিল।’ (সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, আগামী প্রকাশনী, ডিসেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ২২৮)