সোনালু ফুল

সোনালু ফুলঃ প্রকৃতির কানে দুলছে

সোনালি রঙের ফুলে সজ্জিত গাছটির নাম সোনালু, বানরলাঠি বা বাঁদরলাঠি। উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাসে Fabaceae গোত্রের এ বৃক্ষের ফল লম্বাটে। সোনালি রঙের ফুলের বাহার থেকেই ‘সোনালু’ নামে নামকরণ। এর বৈজ্ঞানিক নাম কেসিও ফেস্টুলা (Cassia fistula) এবং প্রকৃত শুদ্ধ নাম কর্ণিকার।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর নাম দিয়েছিলেন অমলতাস। হিন্দিতেও একে অমলতাস নাকেও ডাকা হয়। ইংরেজি ভাষায় একে বলা হয় গোল্ডের শোয়ার (golden shower)। তবে বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে নামেও রয়েছে ভিন্নতা। সোনালু গাছের পাতা ও বাকল ভেষজগুণ সমৃদ্ধ, যা ডায়রিয়া ও বহুমূত্র রোগে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ গাছ জন্মে বেশি। গাছটি সাধারণত ১৫ থেকে ২০মিটার উঁচু হয়ে থাকে। উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু ভূমি সোনালু গাছ উৎপাদনের জন্য উপযোগী স্থান।

জানা গেছে, এ গাছের আদিনিবাস হিমালয় অঞ্চল ধরা হলেও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার অঞ্চলজুড়ে রয়েছে এর বিস্তৃতি। অস্ট্রেলিয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুন্সল্যান্ডের উষ্ণ অঞ্চলে এদের প্রচুর দেখা মেলে। ব্যবহার প্রকৃতিকে নয়নাভিরাম রূপে সাজাতে এবং প্রকৃতি পরিবেশের শোভা বর্ধনে সোনালু গাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়। অস্ট্রেলিয়ায় অনেক সড়কের দুই পাশে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সারিবদ্ধভাবে একই ধরনের গাছ লাগানো হয়।

গ্রীষ্মকালে যখন সব গাছে একসাথে ফুল ফোটে, তখন মনে হয় সোনালি আলোকচ্ছটায় চারপাশ আলোকিত হয়ে গেছে। ভারতের এবং বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে এবং সড়ক-মহাসড়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বন-জঙ্গলে গ্রামীণ রাস্তার ধারে ছোট বড় সোনালু গাছ দেখতে পাওয়া যায়। ফুলের পাঁপড়ি পাঁচটি, মাঝে পরাগ দণ্ড। পাতা হাল্কা সবুজাভ, মধ্য শিরা স্পষ্ট। গাছের শাখা-প্রশাখা কম, কাণ্ড সোজাভাবে উপরের দিকে বাড়তে থাকে, বাকল সবুজাভ থেকে ধূসর রঙের, কাঠ মাঝারি শক্ত মানের হয়। ফুল থেকে গাছে ফল হয়, ফলের আকার দেখতে সজিনা সবজির আকৃতির, তবে সজিনার গায়ের চামড়াতে ঢেওতোলা সোনালু ফলে তা নেই চামড়া মসৃণ। ফল লম্বায় প্রায় এক ফুট, রঙ প্রথমে সবুজ ও ফল পরিপক্ব হলে কালচে খয়েরি রঙ ধারণ করে। ফলে বীজ হয়, বীজ থেকে বংশ বিস্তার ঘটে। কোনো কোনো অঞ্চলে সোনালু’র ফলকে বানর লাঠি হিসেবে চিনে বলে গাছটিকেও তাদের বানরলাঠি গাছ বলে ডাকতে শোনা যায়।

বাংলাদেশের সিংহভাগ সোনালু গাছ জন্মায় প্রাকৃতিকভাবে। প্রকৃতির শোভাবর্ধনকারী ও ভেষজ গুণাবলী সম্পন্ন এই গাছটি বেশির ভাগই বেড়ে উঠছে অযত্ন-অবহেলায়। রোপণের সংখ্যা একেবারেই কম। স্যুটিং স্পট আর রিসোর্ট খ্যাত জেলাজুড়ে আনাচে-কানাচে রয়েছে অসংখ্য সোনালু গাছ। গ্রামাঞ্চলের মেঠো পথে, সোনালি অলংকারে সৌন্দর্য বিলিয়ে নিশ্চুপভাবে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে গ্রীষ্মের প্রকৃতি রাঙানো সোনালু। গ্রীষ্মের রুক্ষ প্রকৃতিতে প্রাণের সজীবতা নিয়ে গাছের প্রতিটি ডাল-পালায় থোকায় থোকায় অলংকারের ন্যায় শোভা পায় সোনালু ফুল। গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গ্রীষ্মের দক্ষিণা হাওয়ায় সোনা ঝড়া সোনালু ফুল যেন প্রকৃতির কানে দুলছে দুল।

প্রকৃতিকে নয়নাভিরাম রূপে সাজিয়ে তুলতে সোনালু ফুলের জুড়ি নেই। পরিবেশ ও প্রকৃতির শোভা বর্ধণে সোনালু দারুণ এক নিসর্গ মায়া এনে দিয়েছে। দীর্ঘ মঞ্জুরিতে ঝুলে থাকা পাঁচ পাঁপড়ি বিশিষ্ট সোনালু ফুলের থোকা অনেকটা অলংকারের মতো। গ্রামের শিশু-কিশোরীরা এখনো ওই ফুল কানে দুল লাগিয়ে খেলায় মত্ত হয়।

ফুলের আভায় শোভিত জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাড়া-মহল্লাহ। গত দুই বছর মহামারি করোনার কারণে প্রকৃতির উপহার হিসেবে স্থানীয় গাছগুলোতে ফুটতে শুরু করেছে নানা রকম ফুল। তবে গ্রীষ্মের এই সময়ে সোনালু ফুলের সোনাঝড়া রূপে মাতোয়ারা প্রকৃতি প্রেমিরা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এই সোনালু ফুল ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য প্রাণ খুলে উপভোগ করতে দেখা গেছে অনেক প্রকৃতি প্রেমিকে।

উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের চুয়ারিয়াখোলা ও বোয়ালী গ্রামে দেখা মেলে দুটি সোনালু গাছের। আর সেখানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থামিয়ে ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেখা যায় নুরুল ইসলাম ও সাইফুর রহমান নামের দুই যুবকে।

সাইফুর রহমান বলেন, কোন একদিন রাস্তায় চলন্ত পথে দূর থেকে এই গাছটি দেখলেও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়নি। পরে নিজের কাজ শেষ করে করে বন্ধু নুরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে সোনালু গাছটির কাছে গিয়ে এর রূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। সত্যি প্রকৃতির এক অপার কারুকাজ।

নুরুল ইসলাম বলেন, একসময় সোনালু গাছ প্রকৃতিতে অনেক বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে তা কমে আসছে। সোনালু গাছের কাঠ তেমন গুরুত্ব বহন না করায় এবং গাছটি খুব ধীর গতিতে বেড়ে উঠায় এই গাছ রোপণে আগ্রহ নেই কারও।

সোনালু গাছ নিয়ে কথা হয় কালীগঞ্জ পৌর এলাকার ভাদার্ত্তী গ্রামের বাসিন্দা প্রকৃতি প্রেমি সুমন সরকারের সাথে। তিনি বলেন, আমরা ছোটকালে এই সোনালু বা বানরলাঠি বা বাঁদরলাঠি গাছ বাড়ির আশেপাশেই দেখেছি। তবে এখন আর দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে এই সোনালু গাছের দেখা মেলে। তবে এটি আমাদের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। গ্রীষ্মকালে জারুল, কৃষ্ণচূড়ার মতো এই সোনালু ফুল প্রকৃতি আমাদের উপহারস্বরূপ দিয়েছে। তবে প্রকৃতিকে সাজাতে আমাদেরও সবার এগিয়ে আসা উচিত।