কোরআন হাদীস

কোরআন হাদীস থাকতে মাযহাব মানতে হবে কেন?

ভূমিকা: উক্ত প্রশ্নে “কোরআন-হাদীস ও মাযহাব’ দুটি বিষয় আনা হয়েছে। একটিকে অপরটির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে একটা ঘোলাটেভাব সৃষ্টি করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। আমরা উত্তর দেবো, ‘কোরআন-সুন্নাহ মানতেই আমরা মাযহাবের অনুসরণ করি। কারণ উভয়টি একই জিনিষ। মাযহাব মানা মানেই কোরআন-সুন্নাহ মানা। আশা করি বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করলে আরো স্পষ্ট হবে। ইনশা-আল্লাহ।

মাযহাবের আভিধানিক অর্থ: مذهب এটি ذهبএর মাসদার (ক্রিয়ামূল)। যখন এটি فى অব্যয়ের সাথে ব্যবহার হয় তখন অর্থ দাড়ায়: ذهب فى المسئلة كذا (এই মাসআলায় তার মত এই) এখন مذهب এর অর্থ হবে কোন মাসআলায় কারো নির্দিষ্ট মত থাকা। (মুখতারুস সিহাহ)
পাঠক! মাযহাবের স্বরূপ জানতে আভিধানিক অর্থটিই যথেষ্ঠ যে, মাযহাব কোনো নতুন মতবাদের নাম নয়, বরং কোরআন-সুন্নাহরই নির্যাসের নাম।

পারিভাষিক অর্থ: যে সকল সমস্যার সমাধানের বিস্তারিত তালিকা কোরআন হাদীসে দেওয়া হয়নি, সেগুলোতে আইম্মায়ে মুজতাহিদীন নিজস্ব যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে কোরআন-হাদিসে ইজতিহাদ করে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, সে সিদ্ধান্ত ও মতকে উক্ত ইমামের মতও পথ বলা হয়। আর এই পথকেই শরয়ী পরিভাষায় মাযহাব বলা হয়।

বিশ্লেষণ: একথা স্বতসিদ্ধ যে, কোরআন-হাদীসে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সকল সমস্যার সমাধান বিধ্যামান। তবে সবগুলো সমস্যার সমাধানের বিস্তারিত তালিকা স্পষ্ট পেশ করা হয়নি। বরং কিছু সমস্যার সমাধান সম্পষ্ট ভাবে, কিছু সমস্যার সমাধান অস্পষ্ট ভাবে, আর কিছু সমস্যার সমাধান ইশারা-ইঙ্গিতে প্রদান করা হয়েছে। অপরদিকে এসব ইশারা ইঙ্গিত অনুধাবন করে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়ার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন বিজ্ঞ উলামাও এ উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত তৈরী হতে থাকবেন বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে পাকে এরশাদ করে গিয়েছেন।

কুরআনের ভাষায় যাঁদেরকে “উলুল আমর” ও শরীয়তের পরিভাষায় ‘মুজতাহিদীন, বলা হয়েছে। সকল মুজতাহিদীনে কেরাম নিজস্ব যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে কুরআন ও হাদীস থেকে ইজতিহাদ করে যে সিদ্ধান্তে উপনিত হন, সে সিদ্ধান্ত ও মতকে উক্ত ইমামের মত বা পথ বলা হয়। আর এ পথকেই শরীয়তের পরিভাষার মাযহাব বলা হয়।

সুতরাং এই অর্থে মাযহাব মানাকে শিরিক বলা হলে তাকে কি বলা হবে? মুজতাহিদ ইমামগণতো মনগড়া কথা বলেন না। তাঁরা ইজতিহাদ করে কোরআন-সুন্নাহর জটিল বিষয়টির যথার্থ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। উম্মতের জন্য কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার এক সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যা না হলে কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা কোন ভাবেই সম্ভব হত না। আর মাযহাবের মাধ্যমেই কেবল কোরআন-সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ করা সম্ভব। মাযহাব মানা কোনো কালেই দূষনীয় ছিলনা।

হাদীসের ছয় ইমামগণ, যাদেরকে মাযহাব অনুসারী লা মাযহাবী সবাই অনুসরণ করে, তাঁরাও কোনো না কোনো মাযহাবের অনুসরণ করতেন, যথা: (লা-মাযহাবী) আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের বড় আলেম নবাব ছিদ্দিক হাসান খান ভূপালী তাঁর ‘আল হিত্তা ফি যিকরিস সিহাহ সিত্তাহ’ নামক গ্রন্থে লেখেনঃ ইমাম বোখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম নাসাঈ এরা সবাই শাফেয়ী মাযহাব অনুসারী ছিলেন, ইমাম আবু দাউদ ছিলেন হাম্বলী অন্য মতে শাফেয়ী, শাইখ জিলানী ইবনে তাইমিয়াহ, ইবনে কাইয়্যিম, মেশকাতের লেখক এরা সবাই হাম্বলী ছিলেন। শাইখ আব্দুল হক এবং শাইখ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ:) এরা ছিলেন হানাফী।

প্রশ্ন হলো, মাযহাব মানা যদি শিরিক হয়, তবে কি যুগযুগের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বগণ শিরক করেছেন? “নাউযুবিল্লাহ” সুতরাং কোরআন-সুন্নাহ থাকতে মাযহাব মানতে হবে কেন? এই প্রশ্ন না করে বরং প্রচার করতে হবে কোরআন-সুন্নাহ মানতে হলে মাযহাব মানতে হবে। (দেখুন: মাওযুআয়ে ফিকহিয়্যাহ تقليد শিরোনামে, তাবাকাতুশ শাফিয়িয়্যাতুল কুবরা: খ: ২ পৃ: ১-১৯)