খালেদ মহিউদ্দিন-ড. সলিমুল্লাহ খান

‘মাদরাসা শিক্ষাকে নকল করেই আজকের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে’

মাদরাসা শিক্ষাকে নকল করেই আজকের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন প্রফেসর ড. সলিমুল্লাহ খান। গতকাল শুক্রবার (১১ জুন) খালেদ মহিউদ্দিন জানতে চায় অনুষ্ঠানে ড. সলিমুল্লাহ খানকে ‘আমাদের মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত ভালো ও উন্নত’ বললেন অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান- এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি একথা বলেন।

অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান তার প্রশ্নের জবাবে লম্বা আলোচনা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক বন্ধুরা বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে একটি বই রচনা করেছেন। তিনি ইংরেজি বই পড়ে বইটি লিখেছেন। আর সেখানে লেখা আছে, ‘আজ থেকে ৮০০ বছর আগে তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যার সূচনা স্থান ছিল প্যারিসে।’ তবে কেউ ভিন্ন কথাও বলেন। তারা বলেন যে, তার সূচনা হয়েছিল ইতালির ভেনিসে। আবার অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্পেন থেকে হয়েছে বলেও মনে করেন। এ ইতিহাস দেখে আমি তাদের প্রশ্ন করলাম! হঠাৎ করে ৮০০ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্ভব হলো কেন? তারা আমাকে জবাব দিলো এটা একটা মিরাক্কেল!

কিন্তু আমি বলি ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি অসত্য তথ্য। কেননা আজকে পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ডিগ্রী দেওয়া হয়- বি. এ, এম. এ, পিএইচডি, তারপর শরীরে যে গাউন পড়ানো হয়, মাথায় টুপি পড়ে এর সবগুলোই আরবদের কাছ থেকে নেয়া। আরবে একসময় এগুলো মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা পড়তেন। তাদরে বিদ্যালয়গুলোকে মাদরাসা বলা হত।

এই বিষয়ে আমার কাছে একটি বইয়ের রেফারেন্স রয়েছে। এ রেফারেন্স আমি পেয়েছি ড. রেদওয়ান সাঈদ এর লেখায়। বইটির নাম ‘জর্জ মাকদিসি’। এটি ১৯৮১ সালে বেরিয়েছে। তিনি তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন, ইউরোপে বর্তমানে যে প্রচলিত সকল পদ্ধতি এবং সিস্টেম রয়েছে, ‘এই সবগুলো মাদরাসা শিক্ষা থেকে এসেছে।’ তার বইয়ের সেই কথাটি আমি টকশোতে বলেছিলাম।

মূলত মাদরাসাকে নিয়ে একটি সম্মিলিত সিলেবাস তৈরি হয়েছিল। একজন নিজামুল মুলক এর অধীনে। তিনি ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। যার নামে মাদরাসা শিক্ষাটি দরসে নিজামী হিসেবে এখনও স্বীকৃত। এই দরসে নেজামীর অনুসারেই ভারতের লখনৌতে একটি মাদরাসা তৈরি হয়। পরবর্তীকালে দারুল উলুম দেওবন্দ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এই মাদরাসা শিক্ষা।

তাহলে আমি বলি যে, মাদরাসা শিক্ষার ইতিহাসকে বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস রচিত হয় কী করে? আপনারাতো মাদরাসা শিক্ষাকে বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে রচনা করতে পারেন না। এটা আমি ইতিহাসের দিক থেকে বলেছি।

মোটকথা মাদরাসা শিক্ষাকে নকল করেই আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছে। আপনি ক্যামব্রিজ কিংবা ইউরোপের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বলেন না কেনো? কোন্ প্রতিষ্ঠান আছে যেটা মাদরাসাগুলোকে অনুকরণ করেনি? আমি তো বলি লাইনে লাইনে তারা মাদরাসা শিক্ষাকে নকল করেছে।

আমাদের দেশে যে মাদরাসা শিক্ষার অবনতি হয়েছে, তার প্রধান কারণ হলো তারা মাতৃভাষা শিক্ষাকে উদ্বুদ্ধ করেনি। আর আজকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে অবনতি হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১০০ বছরের ১০০টি বই রচনা করতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুর রহিম ১৯৮৩ সালে মাত্র ৫৩ টি বইয়ের তালিকা করেছেন। এরপরের ৪০ বছরেও কিন্তু ১০০ টি বইয়ের তালিকা পর্যন্ত এখনো পৌঁছায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এ পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে, তারা না জানে বাংলা আর না জানে ইংরেজি। তো এটা বলে আমি কি এরকম অন্যায় করে ফেললাম?

মোটকথা মাদরাসাগুলোকে আমরা যে গ্রাউন্ডে সমালোচনা করি, এটা কখনোই উচিত নয়। কারণ এটাতো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং এটা একটি ধর্মতত্ত্ব বিভাগ। তাঁরা একটা বিশেষ বিষয়ে পড়াশোনা করান।

আপনি দেখে থাকবেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় তখন কিন্তু তার একটি বিভাগ ছিল ‘এরাবিক এন্ড ফার্সিস। আরো অন্যান্য বিভাগও ছিল। সুতরাং যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি পড়ানো হতো, সেখানে মাদরাসাগুলোকে ঢালাওভাবে সমালোচনা করার কোনো মানে হয় না।

শেয়ার করুন: