বিএনপি

হেফাজত-সরকার দ্বন্দ্ব দেখে খুশি বিএনপি

নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সরাসরি পক্ষে অবস্থান না নিলেও হেফাজতের কর্মকাণ্ডে বিএনপি ও জামায়াত যে অসন্তুষ্ট তা নয়। বরং হেফাজতের কারণে সরকার কিছুটা হলেও ‘চাপের মুখে’ পড়েছে এমনটি বিশ্বাস করেই তারা খুশি। তাই প্রকাশ্যে কৌশলী অবস্থান নিলেও ভেতরে ভেতরে হেফাজতের তৎপরতার দিকে নজর রাখছে বিএনপি ও জামায়াত।

মাঠ পর্যায়ে দল দুটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে হেফাজতের যোগাযোগ আছে বলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে। তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে হেফাজতের কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই।

এদিকে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের কর্মকাণ্ডে বিএনপি-জামায়াতের নেতারা বেশ খেপেছেন। তাঁরা বলছেন, হেফাজতের আন্দোলন বেশ জমে উঠলেও মামুনুলের রিসোর্টকাণ্ড তাতে পানি ঢেলে দিয়েছে। কারণ এই ঘটনায় হেফাজত কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে এবং সরকার কঠোর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।

বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মনোভাব হলো : ‘সরকারের বিরুদ্ধে আমরা তো কিছু করতে পারিনি। হেফাজত সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করতে পারলে অসুবিধা কি!’ তবে এখনি মাঠে নেমে পড়ে তারা আবার ডান বা ইসলামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হতেও রাজি নয়। রাজি নয় সরকারের ধরপাকড়ের মধ্যে পড়তেও।

হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে কি না এটা বলতে পারব না। হতে পারে এটা সরকারি দলের লোকেরা সংঘটিত করে এখন আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘মামুনুল হকের কারণে হেফাজতের কোনো ক্ষতি হয়নি—এটা বলা যাবে না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, হেফাজত ইস্যুতে কৌশলী অবস্থান থেকেই ‘মানুষ মারা যাওয়া ঘটনায়’ প্রতিবাদ-সমাবেশ করেছে বিএনপি। অন্যদিকে হেফাজতের ডাকা হরতালে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে জামায়াত। তবে অনেকের মতে, হেফাজতের আন্দোলন ব্যাপকভাবে গতিশীল হলে বিএনপি বা জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান কী হতো সেটি বলা যাচ্ছে না।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের ডাকা অবরোধ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত। তবে ওই সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে বিএনপিতে মতৈক্য ও সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে পরবর্তী সময়ে জানা যায়। ১২ মে শাপলা চত্বরে জনসভার পর দলের একটি অংশ সেখানে অবস্থান নিয়ে পরের দিন হেফাজতের আন্দোলনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকার কারণ দেখিয়ে দলের অন্য অংশটি এর বিরোধিতা করলে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ও বিএনপি সেদিন শাপলা চত্বরে থাকেনি। এখন অবশ্য ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন পাওয়ার আশায় হেফাজত প্রশ্নে বিএনপি দূরত্ব বজায় রেখে চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হেফাজতের পাশে থাকার জন্য দল দুটির হাইকমান্ড থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে গত ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে গত প্রায় দুই সপ্তায় সংঘটিত সহিংস ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিএনপি-জামায়াতের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অংশ নিয়ে থাকতে পারেন বলে অনেকে সন্দেহ করছেন। অনেকের মতে, গত ১৪ বছরে মামলা-মোকদ্দমা ও নানাভাবে হয়রানির শিকার হওয়া মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ওই সুযোগ নিতে পারেন। আবার নিবন্ধন হারানো জামায়াতের নেতাকর্মীরাও ওই সুযোগ নিতে পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন। দলটি প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করতে পারছে না।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রীরা এ বিষয়ে অভিযোগের আঙুল সরাসরি বিএনপি-জামায়াতের দিকে তুললেও দল দুটির নেতারা তা মানতে রাজি নন।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হেফাজতের ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। থাকতে পারে না। আমরা বিক্ষোভ-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছি মানুষ হত্যার প্রতিবাদে। এখানে আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।’

‘বিএনপি জড়িত একথা সরকার বলছে আমাদের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করার জন্য। কিন্তু হেফাজত কী ঘটাবে সেটি আমরা জানতামই না। তাহলে আমরা মাঠে নামার জন্য নির্দেশনা কিভাবে দেব’ প্রশ্ন তুলে বলেন মির্জা ফখরুল।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘হেফাজতের আলেম-ওলামাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের যোগাযোগ আছে। ইসলামের প্রতি তাদের অনুভূতির ব্যাপারেও আমরা একমত। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই।’ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুর রব ইউসুফী দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের যোগাযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের মতো কাজ করি। তাদের পরামর্শও নিই না, বৈঠকও করি না।’