তারেক-খালেদা

পরিবারেই বিএনপির নেতৃত্ব চান খালেদা জিয়া

রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আর তাই বিএনপি চেয়ারপারসন পদে তিনি এখন থাকতে আগ্রহী নন। ইতোমধ্যেই তিনি দলের একাধিক নেতা কে নতুন একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই নির্দেশ পাওয়ার পরই বিএনপিতে এখন তোলপাড় চলছে। স্বাভাবিক ভাবেই বিএনপিতে তারেক জিয়ার সহজভাবেই তার দলের চেয়ারপারসন হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে তারেক জিয়ার গ্রহণযোগ্যতা এখন শূণ্যের কোঠায়। আর এ কারণেই বিএনপির বিকল্প ভাবনা এসছে।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপির দ্বিতীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তারেক জিয়া। শুধু দ্বিতীয় ব্যক্তি নয়, ক্রমশ তিনি দলের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাবান নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এমনকি অনেক বিষয়ে তিনি খালেদা জিয়ার কতৃত্বকেও চ্যালেঞ্জ করতেন। ২০০৮ এর পর দলে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে এবং তারেক জিয়ার আধিপত্য দলে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু তারেক জিয়াকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমস্যা ছিল। এসব সমস্যা স্বত্ত্বেও তারেক জিয়া দলের ভেতর বিশেষ করে তৃণমুলের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। আর এই কারনেই আন্তর্জাতিক মহলে তাকে নিয়ে নেতিবাচক ধারনার পরও বিএনপি তারেক জিয়াকে পরবর্তি বিএনপির নেতা হিসেবে বিবেচিত হতো।

২০০৪ সাল থেকেই তারেক জিয়াকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক ধারণা শুরু হয়। বিশেষ করে ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তারেক জিয়াকে রাজনীতিতে রাখার ব্যাপারে তাদের নিজেদের আপত্তি সরাসরি ভাবে জানিয়ে দেন। ভারতের একাধিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তারেকের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, তিনি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, লালন করেন এবং তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। একই অভিযোগ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তারেক সম্পর্কে মনে করে অত্যন্ত দুর্নীতিবাজ এবং তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা দুর্নীতি কেন্দ্রিক। আর এই বিবেচনা থেকেই তারেককে বিএনপির নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য সুপারিশ আরে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে এসব আন্তর্জাতিক আপত্তির পরেও দলে তারেক জিয়ার জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক, বিশেষ করে তরুণ এবং তৃণমূলের মধ্যে তারেক জিয়ার নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত ছিল।

কিন্তু ২০১৮ নির্বাচনের পর থেকে আস্তে আস্তে তারেক জিয়ার উপর মোহভঙ্গ করতে থাকে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের। তারা মনে করতে থাকে যে, তারেক জিয়া ব্যক্তিস্বার্থে দলকে ব্যবহার করছেন। দলের কল্যাণের চেয়ে নিজের লাভ-লোকসান বেশি দেখছেন এবং দলকে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাইছেন। একের পর এক তার সিদ্ধান্ত বিএনপির তৃণমূলকে হটচকিত করে ফেলে। ফলে বিএনপির তৃণমূল এখন তারেক জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল নয়। তারা মনে করে যে বিএনপিতে এখন নতুন নেতৃত্ব আসুক। তবে এই প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে দলের সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রবীণ কাউকে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারপারসনের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া তারেক জিয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা স্বত্ত্বেও পরিবারের বাইরে কাউকে দলের প্রধানের দায়িত্ব দিতে রাজি নয়।

উল্লেখ্য যে, বিএনপিতে একবারই পরিবারের বাইরে নেতৃত্ব চলে এসেছিল তিনি ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ড. কামাল হোসেন কে পরাজিত করেছিলেন। এই সময় তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তবে ১৯৮২ সালের ২৪ জানুয়ারী হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর সাত্তার অল্প কিছুদিন নাম মাত্র চেয়ারম্যান ছিলেন। তারপরেই খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বিএনপিতে আর কখনোই জিয়া পরিবারের বাইরে কেউ চেয়ারপারসন হয়নি। এখনো খালেদা জিয়া তারেক জিয়াকেই বিএনপির প্রধান উত্তরাধিকার বিবেচিত করেন। তার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি যদি দলের মধ্যে ওঠে তাহলে জিয়া পরিবারের মধ্যে থেকেই তারেক জিয়ার স্ত্রী, তারেক জিয়ার কন্যা কিংবা কোকোর স্ত্রী বা তার ভাই শামিম ইস্কান্দার অথবা তার বোন সেলিনা রহমানের মত কাউকে দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব দিতে চান। পরিবারের বাইরে বিএনপির চেয়ারপারসন কেউ হোক এটা বেগম খালেদা জিয়া চান না।