নারী জলদস্যু

পৃথিবী কুখ্যাত ৫ নারী জলদস্যু!

জাহাজে কোন নারী থাকলে তা হবে এক দূর্ভাগ্যজনক অভিযাত্রা। ঠিক এমন একটি বিশ্বাসই একসময় প্রচলিত ছিল সমুদ্র দাঁপিয়ে বেড়ানো জলদস্যুদের মধ্যে।

কিন্তু প্রচলিত ধারণাও কিছু দু:সাহসী নারীকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এসব নারীরা জলদস্যুদের সঙ্গে কেবল যোগই দেয়নি তাদের কেউ কেউ অধিকার করে নিয়েছিল নেতৃত্বের আসনও।

হিংস্রতায় তারা একে অপরকে ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি পৃথিবী কুখ্যাত এমন ৫ নারী জলদস্যুর তালিকা তৈরি করেছে ইতিহাস নির্ভর বৃটিশ পত্রিকা হিস্টোরি ডটকম। আসুন আমরা জেনে নিই তাদের সম্পর্কে-

চ্যাঙ ই সাও: চ্যাঙ ই সাও অর্থাৎ চ্যাঙ এর বউয়ের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল চীনের একটি পতিতালয়ে। ১৮০১ সালে জলদস্যু সর্দার চ্যাঙ তাকে বিয়ে করে সমুদ্রে নিয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর তৈরী করা দস্যুদল একসময় পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিনত হয়। এমন শক্তির নেপথ্যে ছিল তাদের দখলে থাকা প্রায় একশোর উপরে জাহাজ এবং প্রায় ৫০ হাজার জলদস্যু। ১৮০৭ সালে চ্যাঙ এর মৃত্যুর পর তার দলে ওপর একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তার বউ চ্যাঙ ই সাওয়ের। নারী নেতৃত্বে দস্যুদলটির শক্তির কোন ক্ষয় হয়নি বরং তারা আগের চেয়েও শক্তিশালীরূপে আবির্ভূত হয়। কেবল চীনের নৌবাহিনী নয় বরং আন্ত:দেশীয় বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই দস্যুবাহিনী। তারা মূলত, মাছ ধরার নৌকা, বিদেশী জাহাজে ডাকাতি এবং অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতো। ১৮৪৪ সালে চ্যাং ই সাও ৬৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

এ্যান বোনি: আনুমানিক ১৭০০ সালে দুর্ধষ্য এন বোনির জন্ম। এক ধনী আইরিশ আইনজীবীর অবৈধ সন্তান হিসেবে তার জীবন শুরু হয়। ১৭১৮ সালে এ্যান আমেরিকায় পাড়ি জমায় এবং সেখানে এক নাবিককে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তারা জলদস্যু অধ্যুষিত বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে যান। সেখানে গিয়ে তিনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেন এবং র‌্যাকম্যান নামে এক জলদস্যু সর্দারের সংস্পর্শে আসেন। র‌্যাকম্যানের বাহিনী ক্যারিবিয়ান সাগরে দস্যুবৃত্তি করতো। এ্যান র‌্যাকম্যানকে বিয়ে করেন এবং র‌্যাকম্যানের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। একসময় তাদের দলে ম্যারি রিড নামে নতুন এক নারী যোগ হয়। ম্যারির সঙ্গে এ্যানের বন্ধুত্ব জমে ওঠে। দুই নারীর বিভৎসতায় ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট-ছোট মাছ ধরার নৌকা এবং বণিক জাহাজগুলো সবসময় তটস্থ থাকতো। কিছুদিনের মধ্যেই র‌্যাকম্যানের বাহিনী ধরা পড়লে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। অন্ত:সত্ত্বা থাকায় সৌভাগ্যক্রমে এ্যান বেঁচে যান। বলা হয়ে থাকে এ্যান ছিলেন অত্যন্ত হিংস্র এবং দুর্র্ধষ্য। কথিত আছে তিনি পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাম পান করতেন আর পিস্তল চালনায় ছিলেন অব্যার্থ।

ম্যারি রিড: সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে ইংল্যান্ডে ম্যারি রিডের জন্ম। ছোট বেলা থেকেই তিনি ছিলেন অভিযানপ্রিয়। তাই মার্ক রিড নাম নিয়ে পুরুষবেশে প্রথম জীবনে তিনি একজন সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাবসায়ী নাবিকের জীবন বেছে নেন। ১৭১০ সালের শেষের দিকে তার জাহাজে দস্যুদের আক্রমণ হয়। এ সময় বিহ্বলতায় তিনি জ্ঞান হারান এবং যখন চোখ খোলেন তখন নিজেকে জলদস্যু র‌্যাকম্যানের জাহাজে আবিষ্কার করেন। এসময় তিনি সেখানে এ্যান বোনির দেখা পান এবং পুরুষ বেশের আড়ালে রাখা তার নারী পরিচয় ফাঁস করেন। এ্যানের সঙ্গে তার দারুণ বন্ধুত্ব হয় তার। এ্যানের মতো রিডও ক্যালিকো জ্যাকের শয্যা সঙ্গিনীতে পরিনত হন। মজার ব্যাপার হলো, ধরা পড়ে ক্যালিকো জ্যাক ও তার বাহিনীর সবার যখন ফাঁসি হয় তখন এ্যনের মতো রিডও অন্ত:সত্ত্বা ছিলো। এ কারণে রিডও বেঁচে গিয়েছিলেন মৃত্যুদ- থেকে। তবে জেলের ভেতর অজানা এক রোগে তার মৃত্যু হয়।

গ্রেস ও’মালি: একটা সময় ছিলো যখন বেশিরভাগ নারী শিক্ষা থেকে ছিলো বঞ্চিত এবং তাদের জীবন ছিলো ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ঠিক সে সময়েই বৃটিশ রাজতন্ত্রের নাকের ওপর দিয়ে ২০টি জাহাজসহ একটি জলদস্যু বাহিনী নিয়ে সমুদ্র দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিল ও’মালে। মাথার চুল ছোট ছোট করে কাটার জন্য ন্যাড়া নামেও তার বেশ পরিচিতি ছিলো। এক শক্তিশালী বংশে ও’মালির জন্ম। যে বংশ পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকা শাসন করতো। ১৫৬০ সালে শাসন ক্ষমতা তার নিজের হাতে আসার পর সমুদ্রে ডাকাতি শুরু করেন। এসময় তিনি স্প্যানিশ ও বৃটিশ জাহাজগুলোকে আক্রমণ করতেন। তার সম্পর্কে কথিত আছে যে, সন্তান জন্ম দেয়ার পরদিনই তিনি সমুদ্রে যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু ১৫৭৪ সালে তাকে বৃটিশ সরকার বন্দি করে। মুক্তির পর তিনি লুটতরাজ করা থেকে বিরত থাকেন। ১৫৯০ সালের দিকে সরকার তার বহর বাজেয়াপ্ত করে। ৬৩ বছর বয়সী ও’মালি রাণী প্রথম এলিজাবেথের কাছে নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্য এবং ক্লান্তির কথা জানিয়ে তার সব জাহাজ ফেরত এবং বন্দী এক ছেলেকে মুক্তির আবেদন জানান। তবে ইতিহাস বলে যে, ১৬০৩ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এবং তার ছেলেরা ডাকাতির সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলো।

র‌্যাচেল ওয়ালে:
বলা হয়ে থাকে, র‌্যাচেল ওয়ালে ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র আমেরিকান মহিলা যিনি দস্যুবৃত্তির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। জানা যায়, র‌্যাচেল ছিলেন প্যানসিলভানিয়ার এক গ্রাম্য বালিকা যে তার কিশোরী বয়সেই বাড়ি থেকে পালিয়েছিলো এবং জর্জ নামে এক মৎস শিকারীকে বিয়ে করেছিলো। এই দম্পতি বোস্টনে বসবাস করছিলেন। কিন্তু আরেকটু ভালোভাবে বাঁচার নেশায় এবং অর্থসংকট তাদেরকে অপরাধের জীবনের দিকে নিয়ে যায়। ১৭৮১ সালে তারা একটি ছোট নৌকা কিনেন এবং নিম্ন আয়ের কয়েকজন নাবিককে নিয়ে একটি দল গঠন করেন। এসময় তারা নিউ ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন জাহাজে ডাকাতি শুরু করেন। তাদের পদ্মতি ছিলো দারুণ, যদিও নির্মম। উপকূল দিয়ে কোন ঝর বয়ে গেলে তারা নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তো দুর্যোগ কবলিত’র বেশে। র‌্যাচেল তাদের নৌকার পাটাতনে গিয়ে দাঁড়াতো এবং পাশ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছে সাহায্য কামনা করতো। এভাবে কোন জাহাজ তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলে র‌্যাচেল ও তার বাহিনী স্বরূপে অবির্ভূত হতো। তারা ঐ জাহাজটিকে লুন্ঠন করতো এবং যাত্রিদের খুন করতো।

১৭৮২ সালে ভাগ্যও তার সঙ্গেও এক নির্মম খেলা খেললো। ঝর একদিন সত্যি সত্যি তার নৌকা ধ্বংস করে দিলো এবং মারা গেলো তার প্রাণপ্রিয় স্বামী জর্জ। তারপর জলের পরিবর্তে ডাঙায় ডাকাতি শুরু করে র‌্যাচেল। ১৭৮৯ সালে এক বোস্টন মহিলাকে আক্রমণ ও ডাকাতি করার সময় র‌্যাচেলকে গ্রেফতার করা হয়। ম্যাসাচুসেটস’র বোস্টনে এখন পর্যন্ত সে-ই সর্বশেষ মহিলা যাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-দেয়া হয়েছিলো।