গোয়েন্দা কবুতর

ডাকপিয়ন ও গোয়েন্দা কবুতরদের গল্প

প্রায় ৫ হাজার বছর আগে থেকে কবুতরকে বার্তা বাহক হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয় ৷ সাধারনত গুপ্তচররা কবুতরের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতো ৷ আর এ ধরনের কবুতরকে আলাদাভাবে রাখা হতো, যেমনটা এখনও শুধু ওড়ানোর জন্য কবুতরকে আলাদাভাবে রাখা হয় ৷ প্রশিক্ষণ তো দেয়া হতোই ৷

কবুতর দিক নির্ণয়ের জন্য পৃথিবীর চৌম্বকীয়ক্ষেত্র ব্যবহার করে। সুর্যের অবস্থান, শব্দ এবং গন্ধও কবুতরকে দিক নির্ণয়ে সহায়তা করে । কবুতর আনার পর ছেড়ে দেবার পর যদি কবুতর আপনার বাসা চক্কর দেয়, তবে বুঝে নিন কবুতর আপনাকে পছন্দ করেছে এবং আপনার বাসা চিনে রাখছে ৷ রেসার বা গিরিবাজ কবুতর সাধারণত প্রথমে সোজা উপরের দিকে ওঠে এরপর চক্কর দেয় ৷

খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালে কবুতরের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হত ৷ রোম এবং প্রাচীন গ্রীসে ব্যাপকভাবে কবুতরের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হত ৷ দ্বাদশ শতকে সিরিয়া এবং পারস্যে প্রথম এক শহর থেকে আরেক শহরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা আদান প্রদান সেবা চালু হয় ৷

খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে দিকে সিরিয়া এবং ইরানে কবুতরের মাধ্যমে বার্তাবহন শুরু হয় ৷ খ্রিষ্টাব্দ ১২ শতকে সিরিয়া ও মিশরে বাগদাদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বড় শহরগুলোর সাথে বার্তাবাহক কবুতরের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা হত ৷ বার্তাবাহক কবুতরই ছিল সে সময়ের (টেলি) যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ৷ রোমে কবুতরের মাধ্যমে অলিম্পিক গেমসের ফলাফল জানানো হত ৷ এ কারনেই এখনও অলিম্পিক গেমসের শুরুতে সাদা পায়রা উড়ানো হয় ৷ ব্রিটেনে ফুটবল খেলার ফলাফল জানানোর জন্য কবুতর ব্যবহৃত হত ৷

১৮০০ সালের দিকে ফ্রান্সের রোথসচাইল্ড (rothschild) পরিবার ইউরোপের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খবর নেবার জন্য কবুতরের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল ৷ তৎকালীন সময়ে কবুতরই ছিল অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যমের চেয়ে কার্যকরি এবং দ্রুত ৷ কবুতরের গতি এবং বার্তা আদান প্রদানের ক্ষমতা রোথসচাইল্ড পরিবারকে প্রতিযোগিতার মধ্যেও সাফল্য পেতে সাহায্য করেছিল, রোথসচাইল্ড এখনও টিকে আছে ৷

১৮৯৬ সালে নিউ জিল্যান্ড এবং গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে চালু হয় বিশ্বের প্রথম সরকারি পিজিয়ন এয়ারমেল সার্ভিস। গ্রেট ব্যারিয়ার উপকূলে যাত্রীবাহী জাহাজ এস এস ওয়াইরারাপার দূর্ঘটনার শিকার হয় । ওই দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন প্রাণ হারান। ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার তিন দিন পরে নিউ জিল্যান্ডে জাহাজডুবির খবর পৌঁছায়। ফলে দুর্গতদের উদ্ধারের জন্য কোনও ত্রাণ পাঠানো সম্ভব হয়নি। এর পরেই দুই ভূখণ্ডের মধ্যে পায়রা ডাক ব্যবস্থা চালু করা হয়। গ্রেট ব্যারিয়ার দ্বীপপুঞ্জ থেকে পায়রার পায়ে বাঁধা বার্তা নিউ জিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরে পৌঁছতে সময় নিত মাত্র ১.৭৫ ঘণ্টা। প্রতিটি পায়রা একসঙ্গে ৫টি বার্তা বহন করতে সক্ষম ছিল। মাত্র ৫০ মিনিটে খবর পৌঁছে দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল ’ভেলোসিটি’ (velocity) নামের এক পায়রা ডাক হরকরা। এই বিশেষ ডাক ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার করা হত বিশেষ ডাক টিকিট।

বিশ্বের অন্যতম বড় সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ১৮৫০ সালে ৪৫টি কবুতরের মাধ্যমে জার্মানি থেকে বেলজিয়ামে লেটেষ্ট খবর এবং স্টক এক্সচেঞ্জের খবর পাঠানো শুরু করে ৷ রেলগাড়ি ৭৬ মাইল যেতে সময় নিত ৪ ঘন্টা, কবুতর নিত ২ ঘন্টা ৷

২০০৪ সালে ভারতে কবুতরের মাধ্যমে বার্তা আদান প্রদান পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয় ৷

এখন প্রশ্ন হলো কবুতর কিভাবে বোঝে যে চিঠিটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছে দিতে হবে ?

কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান প্রদান করতে কবুতরের সাধারণ একটা বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা হয় ৷ কবুতরকে যেখান থেকেই ছেড়ে দেয়া হোক, কবুতর নিজের বাসস্থানে ফিরে যাবে ৷ কবুতরের মাধ্যমে চিঠি পাঠানোর ব্যাপারটা সাধারণ মেইল সার্ভিসের মত না , আপনি নিজের কবুতরকে চিঠি দিয়ে বললেন, যা ব্যাটা চিঠিটা এই ঠিকানায় পৌছে দে আর কবুতর ঐ ঠিকানায় চিঠি পৌছে দেবে – এমন না ৷ যাকে চিঠি পাঠাবেন কবুতরটা তারই হতে হবে ৷

ধরুন আমি আরেক শহরে গিয়ে সেই শহরের অবস্থা আমার বন্ধুকে জানাব ৷ এ জন্য আমাকে আমার সেই বন্ধুর কবুতর নিয়ে যেতে হবে ৷ উক্ত শহরে গিয়ে শহরের অবস্থা লিখে কবুতরের পায়ে থাকা হোল্ডারে চিঠিটি গুজে দিয়ে কবুতরটিকে ছেড়ে দিলে কবুতরটা আমার বন্ধুর কাছে (কবুতরের নিজের বাসায়) চলে যাবে ৷ আর এ দিকে আমার বন্ধুটি খবর নেবে ঐ কবুতরটি এসেছে কি না ৷ যখন দেখবে ঐ কবুতরটি এসেছে যখন চিঠিটি বের করবে ৷ এই হল কবুতরের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর প্রক্রিয়া ৷ ব্যাপারটা কবুতরের রেসের মতই ৷

পূর্বে গোয়েন্দা বিভাগ বা সেনাবাহিনীর নিজস্ব কবুতরশালা থাকত এবং তাতে সুপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কবুতর থাকত ৷ যুদ্ধের সময় বা গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে সৈনিক বা গুপ্তচরেরা কবুতরশালা থেকে কবুতর নিয়ে যেত এবং বার্তা লিখে কবুতরের পায়ে থাকা হোল্ডালে চিঠি লাগিয়ে কবুতর ছেড়ে দিত ৷ কবুতর ছাড়া পেয়ে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজের বাসস্থানে বা বেস ক্যাম্পে ফিরে আসত ৷ স্বাভাবিকভাবেই গোয়েন্দা বিভাগ বা সেনাবাহিনীর কবুতরশালার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিয়মিত খোজ নিত বার্তা নিয়ে কোন কবুতর ফিরে আসল কি না ৷