গঙ্গাপূর্ণার পাঁজরে রূপবতী মানাং

ফেরদৌস জামান
মানাংয়ের ব্যাপারে সর্বপ্রথম জেনেছিলাম ইসরায়েলি এক পর্বত আরোহীর কাছ থেকে। তার সঙ্গে আলাপ হয় ২০০৬ সালে কাঠমান্ডুতে, মাউন্টেইনারিং ইনস্ট্রুমেন্টের এক দোকানে। তারপর থেকেই মানাং যাওয়ার স্বপ্ন। অবশেষে তার বাস্তবায়ন ঘটে দীর্ঘ আট বছর পর ২০১৪ সালে। চেকপোস্টে আনুষ্ঠানিকতার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের কাছে জানতে চাই, ইদানীং কী পরিমাণ অভিযাত্রী আসছে? উল্টেপাল্টে অ্যান্ট্রি তালিকা দেখে বলেন, গতকাল সারাদিনে ৭২ এবং পরশুদিন ৫৯ জন চেকপোস্ট পেরিয়ে গেছে। ধু-ধু রুক্ষ পরিবেশ, জনমানুষের চিহ্ন নেই, নেই কোনো বসতি, একমাত্র মানুষ নারী দোকানি কিছু পুরনো সামগ্রী (অ্যান্টিক) ও তিব্বতিয়ান অলঙ্কার নিয়ে বসে আছেন, পছন্দ হওয়ার পরও কোনো কিছু কিনতে পারলাম না, কারণ পথ অনেক বাকি, অর্থের সংকট ঘটানো অনুচিত।

পিঠে ব্যাকপ্যাকের সঙ্গে অতিরিক্ত সরঞ্জাম হিসেবে ঝুলছে একজোড়া রাবারের পাদুকা, ট্রেকিং পোল, স্লিপিং ম্যাট ও শুকনো খাবারের ব্যাগ, আর বুকে ঢাউস ক্যামেরা। ওজন যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ধূলিমিশ্রিত কঙ্কর পথ, বুটের আঘাতে ফস-স-স শব্দে ছড়িয়ে পড়ে মিহি ধূলিকণা। পরনের ট্রেকিং ট্রাউজার্স ঢেকে পড়েছে একপরতা ধূসর আবরণে। ওই দূরে মানাং, হাতছানি দিয়ে ডেকে যাচ্ছে সেই ওবেলা থেকে কিন্তু পথ তো ফুরোয় না! কয়েক দিন হলো কেবল হাঁটছি আর হাঁটছি মাউন্ট গঙ্গাপূর্ণার পরম আদরে গড়ে ওঠা ছোট্ট বসতি মানংয়ের উদ্দেশে। পর্বতশ্রেণির মাঝ দিয়ে ট্রেইল, হিমশীতল বাতাস তার নিত্যসঙ্গী। উপত্যকায় আপন মনে চরতে থাকা চরমি গাইয়ে (ইয়াক) পাল ক্ষণে ক্ষণেই চলে আসে ট্রেইলে। দীর্ঘ লোমের আবরণে ঢাকা একেকটা ইয়াক স্বভাবে একেবারেই শান্ত। রুক্ষ পর্বতের পেছন থেকে সর্বদাই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে শ্বেত বরফের আস্তরণে ডুবে থাকা শৃঙ্গগুলো। ওসবে আর হওয়ার নয়, মানাং পর্যন্ত তর সইল না, খানিকটা খেয়ে নিতেই হলো। আগের রাতে যেখানে ছিলাম, গৃহকর্ত্রী পরম যত্নে বুক হুইটের (স্থানীয় প্রজাতির গম) কয়েকটি রুটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে পাতায় মোড়া মুলা, পেঁয়াজ ও শুকনো মরিচের সালাদ। মুলার আচার দিতে চাইলে ‘না’ বলেছি। লম্বা ফালি করে কেটে বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো, কেমন যেন বাসি স্বাদের, অথচ এই আচার তাদের যে কোনো খাবারে অত্যন্ত প্রিয় একটি অনুষঙ্গ।

মুগি নামের বসতির পর থেকেই দেখা যায় বিভিন্ন দৈর্ঘ্যরে চওড়া প্রাচীর। উচ্চতা চার ফুটের বেশি নয়। তার ওপর দিয়ে সাজিয়ে রাখা বহু পাথরখণ্ড। পাতলা ও মসৃণ পাথরগুলেরা প্রত্যেকটি আলাদা ও ভিন্নরকম, আবার ভাঙা টুকরোও রয়েছে। খাড়া বা হেলান দিয়ে রাখা পাথরগুলোর বিশেষত্ব হলো, সেগুলো কেবলই পাথর নয়, স্থানীয় ভাষায় খোদাই করা লিপি। কোনোটায় বাণী, কোনোটায় কাহিনী আবার কোনোটাতে অঙ্কিত রয়েছে মহামতী বুদ্ধের নানা ভঙ্গিমার চিত্র ও কথামালা। স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘নামে’ যা সম্প্রতি থেকে বহু প্রাচীন কালের।

ঘড়িতে তখন কয়টা বাজে জানা নেই, তবে সম্মুখে বরফঢাকা পর্বত চূড়ায় শেষবেলার রোদের ঝলক লেগেছে, মাঝে মাথা উঁচু করে রয়েছে গঙ্গাপূর্ণা। তার অল্প কাছেই ভেসে ওঠা আধফালি চাঁদ। ঠিক তার নিচে গঙ্গাপূর্ণা লেক। সবশেষে আরো নিচ দিয়ে বয়ে গেছে নদী। এমন জমজমাট সৌন্দর্য রেখে গেস্ট হাউজের ছোট্ট খোলা বারান্দাটা থেকে উঠতে মোটেই ইচ্ছা হচ্ছিল না। জায়গা করে নেই মানাংয়ের সবচেয়ে কমদামি গেস্ট হাউজে। পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে নড়বড়ে কাঠামোর পুরনো ঘর, তা-ও আবার দোতলা, যেন জোরেশোরে এক ধাক্কা দিলেই গড়িয়ে পড়বে পেছনের খাদে। রুম বরাদ্দ হয় ওপরতলায়। ঠাণ্ডা পানিতে হালকা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ি শহর ছেড়ে গ্রামের বসতির দিকে। সার্বিক বিবেচনায় মানাংকে শহর বললে ভুল হবে না, কারণ রয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জাদুঘর, ট্যুরিজম বোর্ডের অফিস ও পরামর্শ কেন্দ্রসহ একাধিক ক্ষুদে থিয়েটার হল, যেখানে প্রদর্শিত হয় পর্বত আরোহণ ও বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কীয় সিনেমা এবং ডকুমেন্টারি। এছাড়াও রয়েছে দোকান ও বার। শহরের সঙ্গে লাগানো গ্রামের বেশিরভাগ ঘরবাড়ির দরজায় শেকল ওঠানো, যেন জনমানবহীন এলাকা। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে যাই গুম্বা (বৌদ্ধমন্দির)। গুম্বার পথের একটা দেয়ালে শক্ত বিজ্ঞপ্তি আঁটা- গ্রামে প্রবেশ করে বোতল, খাবারের মোড়ক অথবা অন্য কিছু ফেলে পরিবেশ নোংরা করলে ৫০০ রুপি জরিমানা! মন্দিরের অভ্যন্তরে সারি হয়ে বসেছেন লামাগন, নিচু শব্দে সমস্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন। গুরুগম্ভীর পরিবেশ, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে অস্বস্তি হওয়ায় বেরিয়ে পড়ি।

পাশের ঘরটায় বসেছেন বেশকিছু মানুষ, তারা গল্পগুজবে মুখর। লাগোয়া বড় রান্নাঘরে রান্না চলমান, একই সঙ্গে চলছে পরিবেশন। ইচ্ছা পোষণ করায় সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে বলা হলো। বিশেষ কোনো দিন বা উপলক্ষ হয়ে থাকবে, সেজন্যই সারা গ্রাম ফাঁকা। ডাল, সবজি রান্না হয়েছে, কী দারুণ তার সুবাস! সঙ্গে ভাসা তেলে ভেজে তোলা বড় বড় পুরি। অধিকন্তু এক মগ করে ইয়াক দুধের টাটকা চা। স্বসম্মানে হঠাৎ আগত অতিথিকে পরিবেশন করা হলো। রান্নাঘরের সব দায়িত্ব নারীদের। সেখানে পেয়ে যাই আমার মতো আরেকজনকে, নাম মীনা সুকোমুতো, এসেছে টোকিও থেকে। খাবার ঘর থেকে বের হতে গিয়েও আমার সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ থেকে গেল। কয়েক দিন হলো সে মানাংয়ে রয়েছে, সকাল থেকে তাদের সঙ্গে রান্নাবান্নাতেও হাত লাগিয়েছে। সদালাপী মীনার সঙ্গে পিঁড়িতে বসে চলল আলাপ, এদিকে চলছে চায়ে চুমুক। জড়ো হলো পাঁচ-ছয়টি শিশু, ওরা এবং রান্নার দায়িত্বে থাকা নারীদের সঙ্গে বেশ কিছুটা প্রাণবন্ত সময় কাটল। অতঃপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়ি। মানংয়ের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাগাভাগি করছিলাম অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। একপর্যায়ে আলাপ মোড় নেয় নিজ নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিষয়ের দিকে। মন ভারী হয়ে যায়, যখন জানতে পাই সে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়া এবং সব শেষে মিয়ানমার হয়ে নেপাল ঘুরছে, অথচ বাংলাদেশ সম্বন্ধে তেমন কিছুই জানে না। অবশ্য পরক্ষণেই ভাবলাম, শুধু মীন কেন, জীবনে তো এমনও মানুষ পেয়েছি, যে আমার সোনার বাংলার নামই শোনেনি।

মানাংয়ের উচ্চতা ৩৫৪০ মিটার। আমার মাথার পেছনটায় ব্যথা অনুভবের মধ্য দিয়ে উচ্চতাজনিত সমস্যা ধরা পড়ে। মানাংকে ছাড়িয়ে যেসব অভিযাত্রী আরো এগিয়ে যেতে চায়, উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নিতে তাদের বড় এক অংশ সেখানে এক থেকে দুই দিন বা তারও বেশি অবস্থান করে থাকে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গিয়ে বসি গেস্ট হাউজের ডাইনিংয়ে। মোটা খুঁটিতে ঝুলন্ত পাখোয়াজের (ঢোল সদৃশ বাদ্যযন্ত্র), অদৃশ্য টানে এগিয়ে গিয়ে টুকটাক দু-চার টোকায় কয়েকটা গানের মুখ গাওয়ার চেষ্টা চালাই। হিন্দি গানে গলা মেলান হাউজ ব্যবস্থাপক নারী। তিনি বেজায় খুশি, সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে এক গ্লাস রাকসি (স্থানীয় পানীয়)। গান গাওয়ার পুরস্কার নয়, দাম মেটাতে হয়েছে গুনে গুনে ৩০ রুপি। ডাইনিংয়ের সম্মুখভাগের কোনায় চলছে টিভি, কোথাও স্থির নেই, একের পর এক হিন্দি চ্যানেল চলমান। বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি- ইন্ডিয়ান চ্যানেলের ছড়াছড়ি।

জাতিতে তারা গুরুং এবং ধর্মের দিক থেকে তিব্বতিয়ান ধারার বৌদ্ধ। তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার তারিফ করতে হয়। চারিদিকে সাজানো ঐতিহ্যবাহী বাসন-কোসন, বিদ্যুতের আলোয় ঝকমক করছে। ফাঁকে ফাঁকে সাজানো টবে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন প্রকার পাহাড়ি ফুলগাছ ও ক্যাকটাস। তারা খুব মিতব্যয়ীও বটে, এমনও জিনিস যার ব্যবহার শেষ হয়ে গেছে, ফেলে না দিয়ে তাকেও কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। রান্নার মান প্রায় সবখানেই ভালো। যেহেতু সারা পৃথিবী থেকে অভিযাত্রী আসে, তাই তারা ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের নানান অঞ্চলের রান্না করতে সক্ষম। মোট কথা ইকোট্যুরিজম বলতে যা বোঝানো হয়ে থাকে। কথা হয় হাউজের স্বত্বাধিকারী বৃদ্ধ ঝেলজেং গুরুংয়ের সঙ্গে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবেই হয়ে থাকে, অদূরে নদীর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। পুণ্ডুরো কাজে ব্যবহৃত হয়েছে চাইনিজ প্রযুক্তি। মানাং শহরের প্রতিষ্ঠা ১৯৮৩ সালে কিন্তু পাশে তাদের গ্রামের বয়স কত, তা তিনি জানেন না। শুধু জানেন ২০০-২৫০ বছর আগ থেকে তাদের পূর্বপুরুষরা বসবাস করে আসছে।

টিপস: ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু। রেজিস্ট্রেশন ও পারমিটের জন্য যোগাযোগ করতে হবে ট্যুরিজম বোর্ডের স্থানীয় অফিসে। ফি যথাক্রমে ৬ থেকে ১০ ডলার ও সর্বোচ্চ ৫০০ রুপি। গাইড ও পোর্টার ভাড়া যথাক্রমে দৈনিক ২০০০ ও ১৫০০ রুপি। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পর্যাপ্ত পানি ও শুকনো খাবার রাখা জরুরি।