মোবাইল অপারেটরদের বাজেট প্রতিক্রিয়া কী

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর নূন্যতম কর বাড়িয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিম ট্যাক্স দ্বিগুণ করে ২০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে নতুন বাজেটে। এ ব্যাপারে যুগান্তর থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।

মোবাইল অপারেটর রবি, এয়ারটেল এবং বাংলালিংক যুগান্তরের কাছে লিখিত বাজেট প্রতিক্রিয়া জানালেও গ্রামীণফোন সরাসরি প্রতিক্রিয়া দিতে রাজি হয়নি। গ্রামীণফোনের এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান সৈয়দ তালাত কামাল যুগান্তরকে বলেন, আমরা অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মাধ্যমে রাতেই প্রতিক্রিয়া জানাবো। রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও তাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বাংলালিংকের বাজেট প্রতিক্রিয়া

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান বলেন, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার্থে টেলিকম খাতের যে বিষয়গুলো আমরা দীর্ঘ সময় ধরে উত্থাপন করে আসছি সেগুলো এবারের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত না হওয়ায় আমরা আশাহত।

দেশের ডিজিটাল বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এমন একটি পরিস্থিতিতে মোবাইল ফোন সিম কার্ডের মাধ্যমে প্রদানকৃত সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সিমের ওপর কর ১০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০০ টাকা করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক ও সিম করের এই বৃদ্ধি দেশে ডিজিটাল সেবার প্রসারকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আমরা মনে করি। এর পাশাপাশি স্মার্টফোনকে উচ্চবিত্তদের ব্যবহারযোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে এর ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে ফোরজি সেবা চালু হবার পর থেকে দেশের জনসাধারণের মধ্যে স্মার্টফোনের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ সকল শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যম হিসেবে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে শুরু করেছে।

এছাড়া বাজেটে মোবাইল কোম্পানির আয়ের ওপর সর্বনিম্ন শুল্ক ০.৭৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ২ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে যেসব মোবাইল কোম্পানি এখনো লাভজনক নয় সেগুলোর করের বোঝা আরও বেড়ে যাবে এবং শেয়ার হোল্ডাররা এগুলোতে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হবে।

তাইমুর রহমান বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারকে দেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ ও সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করার জন্য আন্তরিক অনুরোধ জানাচ্ছি।

রবি ও এয়ারটেলের বাজেট প্রতিক্রিয়া

রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, বাজেটে মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্প সংশ্লিষ্ট খাতে যে সব কর আরোপ করা হয়েছে তা অত্যন্ত দু:খজনক। প্রস্তাবিত কর ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্ব একটি বড় হোঁচট খাবে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত উচ্চ করের বোঝায় জর্জরিত, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। উচ্চ করের বোঝা নিয়ে এ শিল্প সামনে কতোদিন টিকে থাকতে পারবে তা নিয়ে খাত সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বার বার তাঁদের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যমান কর কাঠামোতেই বাজারে টিকে থাকা চারটি অপারেটরের মধ্যে তিনটিকেই বছরের পরে বছর লোকসানের বোঝা টেনে যেতে হচ্ছে। লোকসান গুনলেও এতদিন তিন অপারেটরের বিনিয়োগকারীদের অনেকটা বাধ্য হয়েই দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে নূন্যতম কর দিয়ে আসতে হচ্ছিল।

এবারের বাজেট নূন্যতম এ কর হার বাড়িয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে, যা আমাদের যারপরনাই হতাশ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে যে মোবাইল অপারেটররা বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, তাদের ওপর এমন কর হারের চপেটাঘাত একেবারেই অপ্রত্যাশিত। টিকে থাকার যুদ্ধে হিমশিম খাওয়া মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পের যখন প্রয়োজন সহযোগিতা ঠিক সে সময়ে এমন কর হার আরোপ আত্মঘাতী।

সব ধরনের মোবাইল পরিষেবা গ্রহণে সম্পূরক শুল্ক হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত ডিজিটাল সেবা গ্রহণে আগ্রহী সব গ্রাহককে নিঃসন্দেহে বাড়তি চাপে ফেলবে। একই সাথে মোবাইল ফোনের সিম কর ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার প্রস্তাবনাও নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার খরচ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবে।

এখন নতুন মোবাইল সংযোগ যারা কিনছেন তাদের বেশিরভাগই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের ওপর ১০০ টাকার বাড়তি সিম কর ও বাড়তি ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে । এমন পদক্ষেপ জাতিসংঘ ঘোষিত এবং সরকার অনুমোদিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের পথকে রুদ্ধ করবে।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলা মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পের বিষয়ে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং প্রস্তাবিত করহারগুলো প্রত্যাহার করে নেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে ফাইভজি, আইওটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো সেবা প্রদানে আগামীতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

এ বিনিয়োগের সংস্থান নিশ্চিত করতে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে টেলিযোগাযোগ খাতের স্থিতিশীল অবস্থা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। আমাদের বিনীত নিবেদন, প্রস্তাবিত কর হার প্রত্যাহার করে এ খাতের জন্য একটি ইতিবাচক কর নীতি প্রণয়ন করা হোক। এতে এ খাত উপকৃত হবে, সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পাবে এবং সর্বোপরি দেশের জনগণের মানসম্পন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।

-যুগান্তর