ঈদে শুভেচ্ছা জানানোর নিয়ম

ঈদ যেমন পৃথিবীর ১৮০ কোটি মুসলমানের সংস্কৃতি, তেমনি আমাদের বাঙ্গালী সংস্কৃতিরও মূল ধারা হলো ঈদ। ঈদের জামাতে ধনী-গরিব সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে যাওয়া, শুভেচ্ছা বিনিময় করা, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া বাঙ্গালী সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্য।

উৎসবের নামে নৈতিকতা বিবর্জিত বল্গাহীন অনুষ্ঠান আড়ম্বরের অবকাশ নেই ইসালামের এ আনন্দে। কারণ ঈদ শুধু উৎসবই নয় বরং তা একটি ইবাদত। ঈদ তো আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সমন্বয়। এ আনন্দ প্রেম ও পুরস্কারের।

পৃথিবীবাসীকে সব ধরণের অপসংস্কৃতির উৎসব থেকে মুক্ত করতে সুস্থ সংস্কৃতির উৎসব ঈদের প্রচলন করেছেন প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (সা.)।

দ্বিতীয় হিজরিতে রোজা ফরজ হয় এবং একই বছর মহানবী (সা.) মুসলিম জাতির জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার প্রচলন করেন। নবীজি (সা.) কর্তৃক প্রবর্তিত ঈদ ইসলামের অন্যসব আনুষ্ঠানিকতার মতোই সম্পূর্ণ অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতিমুক্ত, অর্থবহ, সমৃদ্ধ, প্রাণসম্পন্ন ও কল্যাণমুখী।

শুভেচ্ছা জানানো ঈদের অন্যতম আমল। আমাদের দেশে ঈদ মোবারক বলে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর প্রচলন রয়েছে। ঈদ মোবারক বলে শুভেচ্ছা বিনিময় জায়েজ।

কিন্তু সালামের আগেই ঈদ মোবারক বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা বৈধ নয়। ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা বলা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ আমাদের এবং আপনার পক্ষ থেকে (নেক আমলগুলো) কবুল করুন।

হজরত ওয়াসিলা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে ঈদের দিন স্বাক্ষাত করলাম। আমি বললাম, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা আর তিনিও বললেন, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা। (বায়হাকি: ৩/৪৪৬)

তাছাড়াও ঈদের দিনে সালাম, মুসাফাহা ইসলামী শিষ্টাচারের মৌলিক অনুষঙ্গ। এ দিনে মুআনাকা বা কোলাকুলিরও অনুমোদন রয়েছে। সালাম ইসলামী অভিভাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

সালামের মাধ্যমে আল্লাহ পারস্পরিক মুহব্বত বৃদ্ধি করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ইমানদার না হওয়া পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর একে অন্যকে ভালো না বাসলে ইমানদার হতে পারবে না।

আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজ শিখিয়ে দেব না, যা কারলে তোমরা পরস্পরে ভালোবাসতে পারবে? তোমাদের মধ্যে সালামের প্রচলন করো। (মুসলিম: ১/৪৭) সালামের পূর্ণ বাক্যটি বললেই বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে।

হজরত আবু উমামা (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি আসসালামু আলাইকুম বলবে তার জন্য ১০টি নেকি লেখা হবে, যে ব্যক্তি আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বলবে তার জন্য ২০টি নেকি লেখা হবে আর যে ব্যক্তি আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু বলবে তার জন্য ৩০টি নেকি লেখা হবে।

(তাবরানী: ৩/২০) সালামের উত্তর প্রদান ওয়াজিব। সালাম দাতার চেয়ে উত্তম করেই দিতে হয় সালামের উত্তর। পবিত্র কোরআনুল করিমে এরশাদ হয়েছে, যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হলে তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে অথবা উক্ত সালামের মতোই উত্তর প্রদান করবে।

আল্লাহ সব বিষয়ে পূর্ণ হিসাবগ্রহণকারী। (সুরা নিসা: ৮৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টির পর বললেন, যাও ফেরেশতাদেরকে সালাম দাও এবং তারা কী অভিবাদন করে তা শোন।

তারা তোমাকে যে অভিবাদন করবে তাই হবে তোমার ও তোমার সন্তানদের অভিবাদন। আদম (আ.) গিয়ে আসসালামু আলাইকুম বলে সালাম দিলে উত্তরে ফেরেশতারা আসসালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ বললেন। তারা উত্তরে ওয়া রাহমাতুল্লাহ বাড়িয়ে দিলেন। (বুখারি: ২/৯১৯)

পারস্পরিক সাক্ষাতে মুসাফাহা বা হত মেলানোর অনেক ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি দুজন মুসলিম সাক্ষাত করে পরস্পরে হত মেলানো বা মুসাফাহা করেন তাহলে তাদের উভয়ের হাত পৃথক হওয়ার আগেই তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।

(তিরমিজি: ৫/৭৪; ইবনে মাজা: ২/১২২০) মুসাফাহার নিয়ম হলো দুই হাতে মুসাফাহা করা। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন (মাসাফাহার সময়) আমার হাতটি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দু হাতের মধ্যে ছিল।

(বুখারি: ৫/২৩১১) মুসাফাহার নিয়ম হলো অন্যের ডান হাতকে নিজের দুহাতের মধ্যে এবং নিজের ডান হাতকে অন্যের দুহাতের মধ্যে রেখে এই দুআ পাড়া, ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম। মুসাফাহার পর হাত বুকে লাগানোর কোনো নিয়ম নেই।

মুআনাকা বা কোলাকুলিও মুসলিম সংস্কৃতির অংশ। কোনো ব্যক্তির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত হলে মুআনাকা করা সুন্নাত। মুআনাকা শব্দটির উৎপত্তিই উনুক থেকে। উনুকুন অর্থ হলো ঘাড়।

তাই হাদিসে একে ইলতিজাম (কোলাকুলি) বা মুআনাকা (ঘাড় মেলানো) বলা হয়েছে। ঈদের দিনে মুআনাকা করাকে জরুরী মনে করার কোনো সুযোগ সেই।

কিন্তু স্বাভাবিকভাবে ঈদের দিনে যদি কারো সঙ্গে কয়েকদিন পর দেখা হয় বা এটিই অনেকদিন পরের প্রথম সাক্ষাত হয় তাহলে মুআনাকা করতে কোনো বাধা নেই।

অনেকেরে সঙ্গে আমাদের ঈদ উপলক্ষ্যে কিছুদিন পর দেখা হয়; প্রথম সাক্ষাতে তাদের সঙ্গে মুআনাকা করা ইসলামী সংস্কৃতির অংশ।

হজরত আনাস ইবনু মালিক (রা.) বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীগণ পরস্পরে সাক্ষাত করলে মুসাফাহা করতেন বা হাত মেলাতেন। আর সফর থেকে আগমন করলে মুআনাকা করতেন। (তাবরানি: ৩/২২)

মুআনাকার নিয়ম হলো উভয়ের ডান ঘাড় ও বুক মিলিয়ে ঘাড়ের উপর দিয়ে হাত দিয়ে একবার জড়িয়ে ধরে এই দুআ পড়া- আল্লাহুম্মা জিদ মুহাব্বাতি লিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি।

ইসলামী অভিভাদনের আরেকটি বৈধ বিষয় হলো চুমু খাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীগণ পরস্পরের হাতে চুমু খেয়েছেন বা তাবেয়ীগণ সাহাবীগণের হাতে চুমু খেয়েছেন এমনটি হাদিসে পাওয়া য়ায়।

সন্তান, পিতামাতা, উস্তাদ, আলেম বা নেককার বুজর্গদের হাতে চুমু খাওয়া ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) মদিনায় আগমন করে আমার বাড়ির বাইরে এসে সাড়া দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দিকে দৌড়ে যান তাকে জড়িয়ে ধরেন এবং চুমুখান।

(তিরমিজি: ৫/৭৬) তাছাড়া শিশুদের গালে, কপালে বা মাথায় আদরের চুমু দেয়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর রীতি ছিল। (নববী, আল আজকার: ১/২৬২)

লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারি ও খতিব, বাইতুশ শফিক মসজিদ, বোর্ড বাজার (আ. গণি রোড), গাজীপুর।

শেয়ার করুন: