ফিরে দেখা ১ মার্চ ১৯৯৬

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের মাত্রা ১ মার্চ কেমন ছিল তা ছাপা হয় ২ মার্চ ১৯৯৬ তারিখের পত্রিকায়। ঐদিনের দৈনিক থেকে অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো।

হরতালে জীবনযাত্রা অচল: ব্যাপক গুলী বোমাবাজি চট্টগ্রাম ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত চট্টগ্রাম সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মুক্তির দাবিতে চলমান হরতালে বন্দরনগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অচল রয়েছে।

একই সাথে গুলী, বোমা, ভাংচুরের মত সহিংসতায় নগরী জুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তৃতীয় দিনের মতো আজ শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল চলবে। নগর জুড়ে আতংকগ্রস্ত এই অবস্থায় থেমে থেমে বোমার বিকট বিস্ফোরণ আর মাঝে মধ্যে দু’একটি রিকশার টুং-টাং ‘শব্দ ছাড়া স্বাভাবিক জীবনযাত্রার কোন আলামত চোখে পড়ে না।

নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের অনেক স্থানেই সন্ধ্যার পর সোডিয়াম লাইটসহ বিভিন্ন সড়ক বাতি না জ্বলায় নিষ্প্রদীপ নগরীতে এক ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। মেয়রকে গ্রেফতারের পর চলমান হরতালের দ্বিতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিডিআর, আর্মড পুলিশের সাথে জনতার বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। বিডিআর, আর্মড পুলিশসহ আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন।

হরতাল সমর্থক জনতা বহদ্দারহাটে কয়েকটি কাঠার গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দিলে সব কাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হরতালের মাঝখানে গতকাল সকাল ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টার বিরতিতে রেল স্টেশন এবং বাস টার্মিনালগুলো মানুষের ভিড়ে উপচে পড়ে। ভয়ে আতংকে হাজার হাজার মানুষ নগরী ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামমুখী হতে বাস, ট্রাক, নৌকা-লঞ্চে করে কিংবা ট্রেনের ছাদে বহু কষ্ট করে জায়গা করে নেয়।

এছাড়া এই স্বল্প বিরতিতে হাটবাজারে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। তবুও মানুষ বাধ্য হয়ে অধিক টাকা দিয়ে কিনছে জিনিসপাতি। বুধবার মেয়র গ্রেফতারের দিন থেকে বিক্ষোভকারীরা রাস্তাঘাটে ইট, কাঠ, টায়ার দিয়ে অবরোধ দেয়ায় গতকালের সীমিত সময়েও গাড়ি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় বহদ্দারহাট এলাকা থেকে পুলিশ বিনা অজুহাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম নগর কমিটির অন্যতম সদস্য, চান্দগাঁও মধ্যম থানা শাখার সভাপতি বোরহান উদ্দিন এবং পাঁচলাইশ পূর্ব সাংগঠনিক থানা শাখার সভাপতি বেলায়েত হোসেনকে গ্রেফতার করেছে। এদিকে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এবং গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে রাত অবধি সিটি মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর ষোল শহর ২ নং গেইটের চশমহিলস্থ বাসভবনের আশপাশের এলাকা জুড়ে প্রচণ্ড গুলীর শব্দ শোনা যায়।

উল্লেখ্য, বিরোধী দলের অসহযোগ আন্দোলন শেষ হতে না হতেই গত বুধবার সিটি মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর থেকে বন্দরনগরী জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও দাঙ্গা শুরু হয়। সেই সাথে শুরু হয় অবিরাম হরতাল। হরতালে সংঘটিত সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে শতাধিক লোক। কয়েক কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটছে। প্রতিদিনের মত গতকালও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের শরীক দল জামায়াতে ইসলামী, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি নগরীর বিভিন্ন স্থানে মিছিলে সমাবেশে সরগরম রাখে।

সর্বাত্মক হরতালে অন্য দিনের মত গতকালও দেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর ছিল সম্পূর্ণ অচল। কন্টেইনসহ কোন প্রকার হ্যান্ডলিং হয়নি। রেল যোগাযোগ শিল্পে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ সম্পূর্ণ অচল ছিল। হরতালে রিকশা চলাচলের ঘোষণা থাকলেও রিকশা খুব একটা চলছে না।

দোকানপাট সব বন্ধ। রাস্তাঘাটে যানবাহনের চিহ্ন নেই। বাসা-বাড়িতে সবাই বাইরের বাতি নিভিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করে চরম আতংকে সময় কাটাচ্ছে। ষোল শহর ২নং গেইট, আগ্রাবাদ, নয়া রেল স্টেশন এলাকাসহ সারা শহরের অলিগলিতে ব্যাপক বোমার বিস্ফোরণ সন্ধ্যার পরও অব্যাহত থাকে। নয়া রেল টার্মিনাল ভবনে সকাল ও সন্ধ্যায় দু’দফা বোমা হামলায় ১ জন বিডিআর ও ১ জন আর্মড পুলিশ আহত হয়েছে।

শহরের নীরবতা ভেঙ্গে কিছুক্ষণ পর পর গুলী, বোমা, ভাংচুরের শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত: বোমা, ভাংচুরের শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে জনগণের আতংককে বাড়িয়ে তোলে। এদিকে গতকাল সকালে ছাত্রদল চট্টগ্রাম মহানগরী শাখা দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে। নগর সভাপতি নাজিমুর রহমান এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে চলমান সর্বদলীয় বিরোধী দলের বিক্ষোভ আন্দোলনকে প্রতিহত করার হুমকি দেয়া হয়েছে। প্রতিরোধ কার্যক্রমে প্রশাসনের সাথে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা থাকবে বলে নেতৃবৃন্দ জানান। সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তারা গত ৩ দিনে নগরীতে আন্দোলনের নামে লুটপাট, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

এদিকে গতরাত সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত নগরীর লালখান বাজার এলাকায় বিক্ষোভকারী ছাত্রদল সমর্থকদের ব্যাপক বোমাবাজি ও গোলাগুলী বিনিময় হয় এক পর্যায়ে কিছু দোকান পাটে আগুন ধরিয়ে দেয়ার খবর পেয়ে দমকল বাহিনী সেখানে যায়। কিন্তু দোকান পাটে আগুন ধরিয়ে দেয়ার খবর পেয়ে দমকল বাহিনী সেখানে যায়। কিন্তু বাধার মুখে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।

গভীর রাত পর্যন্ত বন্দর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারী স্থাপনা ছাড়া রাস্তাঘাটে কোথাও পুলিশ নেই। ফলে লুটপাটের আশংকায় জনসাধারণ সন্ত্রস্ত। কোন কোন স্থানে গুলী ও বোমাবাজির শব্দ পাওয়া গেছে। নগরীতে নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি বিরাজমান।