মামুনুল হক

মামুনুল হকের মোবাইল ফোনে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

গত ১৮ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করা হলেও সেসময় তার মোবাইল ফোন জব্দ করা যায়নি। পুলিশ শুরু থেকেই বলছে, মামুনুলের ফোনের ভেতরে অনেক ক্লু লুকিয়ে রয়েছে। সেটি উদ্ধার করা গেলে অনেক নতুন তথ্য সামনে আসবে। শেষ পর্যন্ত তার লুকানো ফোনটি উদ্ধার করতে পেরেছে পুলিশ। মোহাম্মদপুরের মাদ্রাসার একটি কক্ষ থেকে সেটি উদ্ধারের পর ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। এরই মধ্যে তার মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটিং লিস্ট থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে তার কাছে লাখ লাখ টাকা আসার তথ্য মিলেছে।

পুলিশ বলছে, মামুনুল হকের ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের চিত্র দেখা গেছে। ভারতের বাবরি মসজিদ, কওমি মাদরাসার ছাত্রদের শিক্ষা ও হেফাজতে ইসলামের নাম করে মামুনুল মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোটি কোটি টাকা এনেছেন। সেসব টাকা বিভিন্ন উগ্রবাদী নাশকতামূলক কাজে ব্যয় করা হচ্ছে।

মোবাইল ব্যাংকিং ও প্রচলিত ব্যাংকের হিসাব নম্বরে এসব অর্থ তার কাছে পৌঁছত। ঢাকায় ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণ করেছেন মামুনুল। এই মসজিদের নামে কাতার, দুবাই ও পাকিস্তান থেকে টাকা আনার প্রমাণও মিলেছে। মামুনুলের মোবাইল ফোনে থাকা তথ্য যাচাই করে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। ‘শিশু’ বক্তা রফিকুল ইসলাম মাদানীর মতো মামুনুলের ফোনেও চমকপ্রদ কিছু পাওয়ার আভাস দিয়েছেন তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তার ফোনটির খোঁজ পাওয়া যায়। মাদ্রাসা থেকে ফোনটি উদ্ধারের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। অনেক সোর্স থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা সংগ্রহের তথ্য ফোন থেকেই আমরা পেয়েছি। সিআইডি ও বাংলাদেশ ব্যাংক তার অর্থের বিষয়গুলো আরো বিশদভাবে দেখবে।’

নারায়ণগঞ্জের রিসোর্টকাণ্ডের পর একের পর এক ফোনালাপ ফাঁসের মাধ্যমে মামুনুলের আসল চরিত্র উন্মোচিত হয়। সে সময় মামুনুলকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পুলিশের নীতিনির্ধারকরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার মোবাইল ফোনটি তখন জব্দ করা গেলে আরো অনেক তথ্য সামনে আসত বলে মনে করেন তারা।

এদিকে, মোহাম্মদপুর থানায় হামলা ও চুরির মামলায় সাত দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত নাশকতার দুই মামলায় মামুনুলের আরো সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে তাঁর জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে।

আদালত সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় মতিঝিল থানার মামলা এবং চলতি বছরের ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররমে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মামুনুলের ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। একই মামলায় হাবিব ও কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদের রিমান্ড আবেদন করা হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াসির আহসান চৌধুরীর আদালত হাবিব ও মামুনুলের সাত দিন রিমান্ডের আদেশ দেন। জালাল উদ্দিন আহমেদের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গতকাল পল্টন থানায় আরেকটি মামলায় জুনায়েদ আল হাবিবের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

ডিবির সূত্র জানায়, মামুনুলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কর্মকাণ্ড এবং জামায়াত কানেকশন পাওয়া গেছে। এ কারণে নাশকতায় তাঁর উদ্দেশ্য এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামুনুল ভারতবিরোধী মতাদর্শীর লোকজন এবং সরকারবিরোধী দলের লোকজনকে একসঙ্গে করে নাশকতার পরিকল্পনা করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠান বানচাল করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। এ জন্য ভারতে মুসলমানদের নির্যাতনে মোদি জড়িত বলে ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে আসেন। এই ইস্যুতে সাড়া দেশে তিনি কিছু রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে ‘বড় মুভমেন্ট’ করার পরিকল্পনা করেন। ২০১৩ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারের পতন ঘটিয়ে অন্য দল ক্ষমতায় আসতে পারবে বলে ধারণা ছিল তাঁদের। হেফাজতের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় তাঁর কিছুই হবে না বলে বিশ্বাস ছিল মামুনুলের। এ কারণে কৌশলে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন। প্রথমে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে মূর্তি বলে বিরোধিতা শুরু করেন। পরে মোদিবিরোধী স্লোগান তোলেন। মামুনুলের নাশকতার পরিকল্পনার পাশাপাশি তাঁর আর্থিক দুর্নীতির ব্যাপারে খোঁজখবর শুরু করেছেন গোয়েন্দারা। তাঁর নাশকতায় ব্যবহৃত টাকা কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় গেছে তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে তাঁর ব্যাংক ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।