পেঁয়াজ

সমুদ্রপথে পেঁয়াজ এলেও প্রভাব নেই বাজারে

ভারতের বিকল্প দেশ থেকে সমুদ্রপথে আমদানি করা পেঁয়াজের চালান খালাস হতে শুরু করেছে। এর পরও রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম কমছে না। উল্টো সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২১ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এর পরও অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েই যাচ্ছে। ফলে পণ্যটির দাম কমাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি করতে হবে।

১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই সময় খুচরা বাজারে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ওঠে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। তবে ওই ঘটনার পনেরো দিন পর দাম কিছুটা কমে কেজিতে ৬৫-৮০ টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু সরবরাহের সংকটের অজুহাতে আবারও পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিকেজি পেঁয়াজ খুচরা বাজারে আবারও ১০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। রোববার রাজধানীর শ্যাম বাজারের পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮৬ টাকা, যা সাত দিন আগে ছিল ৬৫ টাকা। সাত দিনের ব্যবধানে পাইকারিতেই দেশি পেঁয়াজ বাড়ানো হয়েছে ২১ টাকা। এছাড়া মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা, যা সাত দিন আগে ছিল ৬০ টাকা। পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা, যা একদিন আগে ছিল ৫০ টাকা।

একই দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার ও নয়াবাজার ঘুরে এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা, যা সাত দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৮৫-৯০ টাকা। আর আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা, যা সাত দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৭০-৮০ টাকা। জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়লেও দাম কমার খবর নেই। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম কমতে দিচ্ছে না। তাদের চাপে প্রশাসনও বাজার মনিটরিং কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে।

রোববার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আজহার আলী বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের পর থেকে এ দিন পর্যন্ত ১২১৮টি আমদানি অনুমতিতে (আইপি) ৭ লাখ ৭৭ হাজার ১৭৫ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতিপত্রে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে রোববার পর্যন্ত ৪০টি আইপির ২ হাজার ৫৮৫ হাজার টন পেঁয়াজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে দেশে এসেছে। আরও পেঁয়াজ আসার জন্য পাইপলাইনে আছে, যা মাস দুইয়ের মধ্যে দেশে আসবে।

ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণে পেঁয়াজ মজুদ আছে, তা দিয়ে দুই মাস চলবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলছে, প্র্রতিবছর দেশে প্রায় ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। চাহিদার ৬৫-৭০ শতাংশ পূরণ দেশি উৎপাদন থেকে। বাকিটা আমদানি করে পূরণ করা হয়। এছাড়া পেঁয়াজের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বাকিতে (৯০ দিনের জন্য) এলসি খোলার সুবিধা দেয়া হয়েছে। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবুও বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

কারওয়ান বাজারে খুচরা পেঁয়াজ বিক্রেতা মো. সুমন বলেন, পাইকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আছে। কিন্তু তারা সিন্ডিকেট করে আবারও দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

দেশের ভোগ্যপণ্যের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, খাতুনগঞ্জে সপ্তাহখানেক ধরে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা পেঁয়াজ আছে, তবে এখনও সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে যে কারণে দাম বেশি। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পেঁয়াজের বাজারে কোনো ভারসাম্য নেই। দুই-একদিন পরপর দাম ওঠানামা করছে। সমুদ্রপথে আমদানিকৃত পেঁয়াজ এখনও সেভাবে বাজারে আসেনি। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে।

শ্যামবাজারের আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতা হাজী মো. মাজেদ বলেন, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর সরবরাহ চেইনে একটা সংকট তৈরি হয়েছিল, যা পুরোপুরি কাটেনি। সবকিছু স্বাভাবিক হতে আরও মাসখানেক লাগবে। তবে দেশে ভারতের বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। তাই দাম কমে আসবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, দেশি পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কৃষক এসব পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। তাই পেঁয়াজ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আর পেঁয়াজের অবৈধ মজুদ বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করা হলে সরকার প্রচলিত আইনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।