ভারতে নাগরিকত্ব আইন আমাদের বোধগম্য নয় : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কেন করল তা বাংলাদেশ সরকারের কাছে বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না, (ভারত সরকার) কেন এটা করল। এর কোনো প্রয়োজন ছিল না।’

আবুধাবিভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য গালফ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে এই মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি সফরের সময় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করা হয়। গত শনিবার গালফ নিউজের অনলাইন সংস্করণে তা প্রকাশ করা হয়।

সাক্ষাত্কার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১১ ডিসেম্বর ভারত সরকার নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) সংশোধন বিলটি পার্লামেন্টে পাস করে। এর মাধ্যমে ২০১৪ সালের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ভারতে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়।

তবে ধর্মীয় নিগ্রহের কারণে বাংলাদেশ থেকে কেউ ভারতে যাওয়ার কথা অস্বীকার করে বাংলাদেশ বলেছে, দেশে এক কোটি ৬০ লাখ হিন্দুর একটি শক্তিশালী জনগোষ্ঠী বসবাস করছে, যা মোট জনগণের ১০.৭ শতাংশ এবং দেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ০.৬ শতাংশ।

ভারত থেকেও কেউ আসেনি : এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা গালফ নিউজকে জানান, ভারত থেকে বাংলাদেশে পাল্টা অভিবাসনের (রিভার্স মাইগ্রেশন) কোনো রেকর্ড এখন পর্যন্ত নেই। তিনি বলেন, ‘না, ভারত থেকে কোনো পাল্টা অভিবাসন ঘটেনি। ভারতের ভেতরেই বরং মানুষ নানা সমস্যা মোকাবেলা করছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই আইনের কারণে ভারতীয় মুসলিমরা যদি তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তারা বাংলাদেশে আশ্রয় চাইতে পারে।

এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘(এখন পর্যন্ত) এটা (ভারতের) অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশ সব সময়ই এটা মেনে আসছে যে সিএএ ও এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার বলা হচ্ছে যে এনআরসি একটি অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম। গত অক্টোবরে দিল্লি সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবেও আমাকে একই বিষয় (অভ্যন্তরীণ) বলে নিশ্চিত করেছেন।’

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতেই হবে : শেখ হাসিনা বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো বাড়ছে। তবে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের শুরুটা যেহেতু মিয়ানমারে, সেহেতু তাদেরই সমাধান করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিয়ানমার সমস্যা সমাধান এবং ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ দূর করতে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাদের ফেরত পাঠানোর দুটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এটা পরিষ্কার যে মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের জন্য কোনো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। তিনি বলেন, যদি এই সংকটের অবসান না হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। সুতরাং এর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এতে সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে।

বিদ্যুৎ উত্পাদনে কয়লার ব্যবহার পৌঁছবে ২৫ শতাংশে : বিদ্যুৎ উত্পাদন বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার কয়লার ব্যবহার আরো বাড়াতে চায়। যদিও পরিবেশবাদীদের এ নিয়ে আপত্তি আছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আশ্বস্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উত্পাদন কেন্দ্রগুলো বড় ধরনের পরিবেশগত ক্ষতি করবে না। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ তৈরিতে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ খুবই কম। সুতরাং একটা যৌক্তিক পর্যায়ে এর সীমাবদ্ধতা রাখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উত্পাদনে বর্তমানে কয়লার ব্যবহার ২.৫ শতাংশ। সরকার পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ উত্পাদনে ২৫ শতাংশ কয়লার ব্যবহার করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, এক দশক আগেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উত্পাদনে ৯০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করত। কিন্তু অভ্যন্তরীণ গ্যাস দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বিকল্প হচ্ছে কয়লা, তরল জ্বালানি ও পরমাণু শক্তি। এ প্রসঙ্গে তিনি জনগণের দ্রুত বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির কথা বলেন।

উপকূলীয় এলাকায় ওয়ানটাইম প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ হবে : বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি উপকূলীয় এলাকায়, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে একবার ব্যবহার করা (ওয়ানটাইম) প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করার চিন্তা করছে। যদিও ২০০২ সালে দেশটিতে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আইন কার্যকর করতে না পারার কথা স্বীকার করে বলেন, এর জন্য ভালো বিকল্পও ছিল না। এখন ভালো বিকল্প রয়েছে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের পাটের সেলুলোস দিয়ে তৈরি ব্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমিই এই ব্যাগের নাম সোনালী ব্যাগ নামকরণ করেছি।’