সুন্দরবন বাঁচুক, বাঁচুক বাংলাদেশ

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ প্রায় হেরে গেছে সুন্দরবনের কাছে। যেটুকু তাণ্ডব চালিয়েছে, তা যৎসামান্যই বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ঝড়ের আকার এবং গতির পর্যবেক্ষণে আতকে ওঠেছিল মানুষ। ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতিও ছিল বেশ। ঝড়ে কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটলেও আপাতত স্বস্তি জনমনে। কারণ ফের বেঁচে গেল বাংলাদেশ! বেঁচে গেল অসংখ্য মানুষ!

ঘূর্ণিঝড় ফণীর পর বুলবুল আবারও মার খেল সুন্দরবনের কাছে। আর এতে করেই সুন্দরবনকে আপন জানছে মানুষ। প্রকৃতি-ই মানুষের আসল বন্ধু, তা বারবার বুক চিতিয়ে প্রমাণ করছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিজেকে বিপন্ন করে যেন জনজীবন সুরক্ষায় দেয়াল তুলে বুকে আগলে রাখছে সুন্দরবন।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ভয়ঙ্কর ক্ষতি না হওয়ায় ফের আলোচনায় সুন্দরবন। উন্নয়ন? না কি প্রকৃতি রক্ষা-এই আলোচনা আজ সর্বত্রই। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমে সকলেই মত দিচ্ছেন সুন্দরবন ধংস করে উন্নয়ন নয়। আগে জীবন, পরে উন্নয়ন।

বাংলাদেশ কমিনিউস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মনে করেন, সুন্দরবনের চাইতে ভালো বন্ধু বাংলাদেশের আর কেউ নেই। বামপন্থী এই রাজনীতিক বলেন, ‘সুন্দরবনের অবদান আমরা সহজেই ভুলে যাই। অথচ নিজেকে বিপন্ন করে বারবার এই জনপদকে আগলে রেখেছে।’

তিনি বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থেই আমাদেরকে সুন্দরবন রক্ষা করা উচিত। অথচ উন্নয়নের নামে আমরা সুন্দরবনকে ধ্বংস করছি পরম্পরায়। যে বিদ্যুৎ প্রকল্প বিদেশে অচল হচ্ছে, সেই প্রকল্প সুন্দরবনে এসে পত্তন গড়ছে। জনবিচ্ছিন্ন এই উন্নয়ন এখনই রুখে দেয়া দরকার। নইলে কেউ রক্ষা পাব না।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান এবং মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘জীবন বিপন্ন করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জায়গা দিচ্ছি সুন্দরবনে! টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে ভবিষ্যৎকে নিরাপদহীন না করে। নদী ভরাট করে রাস্তা বানিয়ে আপনি জিডিপি বৃদ্ধি দেখাতেই পারেন। কিন্তু ৫০ বছর পর ওই নদী ভরাটের যে ক্ষতি, তা আপনি কোনোভাবেই পূরণ করতে পারবেন না। সুন্দরবন ধ্বংস করে যেসব প্রকল্প নেয়া হচ্ছে তাতে জিডিবি বাড়বে। কারণ, সুন্দরবন নিজে জিডিপি বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে না। কিন্তু দেশকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। অথচ, এই সত্য আমরা স্বীকার করি না।’

রামপাল প্রকল্প নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্তারা বলছেন, এটি সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না। তাদের এ ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, ‘বুড়িগঙ্গা তার চোখের সামনে। এই বুড়িগঙ্গাকে তারা বাঁচাতে পারছে না।’

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সুন্দরবন আমাদের রক্ষাকবচ। এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আমরা প্রকৃতির এই সম্পদের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারি না। সুন্দরবন ধংস করে কোনো উন্নয়ন মানুষের কল্যাণ হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘ঝলকের উন্নয়ন দিয়ে মানুষকে ঘোরে রাখা যাচ্ছে বটে, কিন্ত এই ঘোর তো একসময়ের বিপদের কারণ হবেই। আমরা উন্নয়নের নামে এক অভিশপ্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখান থেকে বের হওয়া সময়ের দাবি।’