ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মুক্তির ফাইনাল আজ

নিউজিল্যান্ড দল এমন প্রাণভরে ফুটবল খেলছে যে দেখে মনে হচ্ছে, আজ বোধহয় ইংল্যান্ডের সঙ্গে ওদের কোনো ফুটবল ফাইনাল।

এদিকে ইংলিশরা উইম্বলডন, ফুটবলের দলবদল—এসব নিয়ে এত মেতে আছে যে মনেই হচ্ছে না তাদের দেশ একটা বিশ্বশ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামছে।

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনাল তাহলে কোথায়? আছে। আসছি।

ইংল্যান্ড ফুটবলের দেশ। নিউজিল্যান্ড রাগবিতে মত্ত। ক্রিকেট তাদের কাছে সেছলের মতোই। এই নিরুৎসাহের পটভূমি শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে একটা ছায়া বিছিয়ে রাখছে। ক্রিকেটীয় উত্তেজনা তাহলে কোথায়? আছে। আসছি।

ইতিহাসেও দুই দেশের বিরোধের এমন কোনো উদাহরণ নেই। ক্রিকেটের মতো রাগবি বা অন্যান্য খেলাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, কিন্তু সেখানেও যাকে বলে ‘আর্চ রাইভাল’ তেমন কোনো ব্যাপার নেই। সেটা বরং ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার জন্য বরাদ্দ।

নিউজিল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ায় ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকা আরেকটা প্রতিপক্ষ, যারা অস্ট্রেলিয়ার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বলে কখনো কখনো ‘শত্রুর শত্রু’ সমীকরণে ইংল্যান্ডের পক্ষেই। এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো তাদের দেশের প্রধানও ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ। তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁঝ কোথায়? আছে। আসছি।

ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্ররা জেনে থাকবেন ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করতে গিয়ে তাসমানের ওপারেও গিয়েছিলেন। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে প্রবল বাধার মুখে পড়েন। ওদের মাওরি আদিবাসীরা এমন পাল্টা লড়ে যে তিনি প্রথম অবস্থায় খুব সুবিধা করতে পারেননি।

নিজের প্রথম ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় মাওরিদের প্রবল বিক্রমের কথাটা উল্লেখ করেছিলেন আলাদাভাবে। এখানে তাহলে কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস মিলছে।

আরো আছে। অস্ট্রেলিয়া জয় যত সহজ ছিল নিউজিল্যান্ডের অংশটুকু অত সহজে ব্রিটিশদের বাগে আসেনি। এবং ইতিহাসের পরের ধারায় ওদের আলাদা হওয়াটা আরো তাৎপর্যময়। ব্রিটিশরা রাজ্য জয় করেছে, যেখানে গেছে সেখানেই স্থানীয় মানুষ, আদি অধিবাসীদের ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আর এখানেই নিউজিল্যান্ড অনন্য।

তাদের আদিবাসী মাউরিদের ওরা ওদের সামাজিকতায় এমনভাবে সংযুক্ত করেছে যে পুরো দুনিয়ার কাছে এটি একটি উদাহরণ। রেড ইন্ডিয়ান-অ্যাবঅরিজিনালরা টিকে আছে শুধু নাম নিয়ে, সেখানে নিউজিল্যান্ডের মাউরিরা পুরোপুরি মূলস্রোতে। ব্রিটিশ বা ইংল্যান্ড রাজকে এভাবেই ওদের শক্তিটা ওরা দেখিয়ে এসেছে ইতিহাসে। ক্রিকেটে! আজ দেখানোর দিন হয়তো তাদের।

যেমন—ইংল্যান্ডেরও আজ সম্ভবত একটা পাওনা বুঝে নেওয়ার দিন। যে খেলাটা ওরা আবিষ্কার করেছে, সেই খেলাটায় আনুষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি ওদের হয়নি কোনো দিন। হতে পারে আজ। লর্ডসে।

আজ তাই ক্রিকেটের আদিভূমিতে ফেরার দিন কিংবা মাউরিসূত্রে শুরু হওয়া যে ঐতিহাসিক বীরত্ব ক্রিকেটের স্তর বেয়ে আজ তাঁর আধুনিক হওয়ার দিনও।

ইংল্যান্ড না নিউজিল্যান্ড?

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ শেষে মরগান বসে আছেন প্রেস কনফারেন্স রুমে। টিভি ক্যামেরার আলো জ্বলছে। না জ্বললেও জ্বলত। এমন উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল তার চোখ-মুখ। সামনে সাংবাদিকরা। ওদের প্রশ্নের ভাষা আর ধরনে মনে হচ্ছিল সামনে মানুষ নয়, কোনো মহামানব বসে। আর এঁরা সব এসেছেন বীরপূজা করতে। ‘কী দারুণ দেখালেন’ ‘অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দিলেন’ জাতীয় বাক্য জুড়ে থাকল প্রশ্নের আগে-পরে।

মনে পড়ল, চার বছর আগের এডিলেডের এক সন্ধ্যা। সেদিনও মরগান বসে। প্রেস কনফারেন্স রুমে। টিভি ক্যামেরা জ্বলছিল। তবে আলোতে মরগান যেন অসহ্য বোধ করছিলেন। তাঁর তো তখন লুকানো দরকার। তিনি যেন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো।

সাংবাদিকরা শত্রুপক্ষের সেই আইনজীবী যে একের পর এক অসম্মানজনক প্রশ্ন করে বিচারের আগেই রায় দিয়ে ফেলেন। ‘কবে যাবেন’ ‘আপনার কি মনে হয় না ইংল্যান্ডের মর্যাদা আপনি রাখতে পারেননি।’ বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর কোচ মুরসও ছিলেন সঙ্গী। তিনি বিদায় নিলেন।

কিভাবে কিভাবে যেন মরগান রয়ে গেলেন। কী জাদুমন্ত্র কোথা থেকে এলো আমরা কেউ জানি না, কিন্তু এ আসলে ক্রিকেটীয় রূপান্তর নয়, যেন জাদুরই পরশ। নইলে সেই একঘেয়ে, জড়সড় ইংল্যান্ড কী করে এমন দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে। পরের চার বছরে ওয়ানডে ক্রিকেটটা যেভাবে খেলেছে, ওয়ানডে ব্যাটিংয়ের যে নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে তাতে কাপটা আসলে ওদের পাওনা। কালও মরগানকে দেখছিলাম।

কী আত্মবিশ্বাসী চেহারা। ইংলিশ ইতিহাসের বরেণ্য বীরদের সার্থক উত্তরাধিকারই যেন। দৃঢ়। সাহসী। জানালেন, দলের প্রত্যেকেই খেলার জন্য তৈরি। খুব হাইস্কোরিং ম্যাচ হবে বলে মনে করেন না, নিউজিল্যান্ডের ছোট স্কোর ডিফেন্ড করার ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন—কথাগুলো বললেন অঙ্ক করা হিসাবের মতো করে। মানে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতার জন্য চিন্তায়-ছকে যে রকম ধার দেওয়া দরকার তার সবই করা হয়েছে। কাপটা ইংলিশদের পাওনা। ওদের দিকেই পাল্লাটা হেলে।

ইংলিশরা হচ্ছে ব্যর্থতার ভিত থেকে তৈরি হওয়া বিত্তবান। নিউজিল্যান্ড যখন সফল মধ্যবিত্ত। সেই মধ্যবিত্ত যারা নিজেদের আয় জানে, ব্যয় জানে, খরচের খাত জানে। তাই ওদের কিছুতে টান পড়ে না। নইলে যে বিশ্বকাপকে সবাই ধরে নিয়েছিলেন সাড়ে তিন শ-চার শ রানের বিশ্বকাপ হবে, সেটাকে তারা কী করে আড়াই শর বিশ্বকাপ বানিয়ে ফেলে।

আফগানিস্তান বাদে আর একটা দল এবারের বিশ্বকাপে তিন শ পার হতে পারেনি একবারও। দলটার নাম নিউজিল্যান্ড! আফগানিস্তান তিন শ না করতে পারার দায় নিয়ে দশম হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে।

আর নিউজিল্যান্ড, কেন উইলিয়ামসনের নিউজিল্যান্ড, তিন শ না করেও ফাইনালে। ক্রিকেট ব্যাট-বল থেকে শুধু ব্যাটের খেলা হওয়ার যে একমুখী রাস্তায় এগোচ্ছিল সেখান থেকে খেলাটাকে ওরা বাঁচিয়েছে। জানাল, আজও ক্রিকেটে বোলার আর ফিল্ডার নামের দুটি জাতি আছে।

এদেরও মানে আছে। মূল্য আছে। একটা বল আর তৎপর শারীরিক মনোযোগে এরা ব্যাটের শক্তিকে অগ্রাহ্য করার রোমাঞ্চ দেখাতে পারে। মোটের ওপর এই বিশ্বকাপে সবাই খেলেছে ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে। নিউজিল্যান্ড খেলেছে সম্পূর্ণ ক্রিকেট।

আর এটাই ওদের চিরকালীন শক্তিও। হ্যাডলি, মার্টিন ক্রো-উইলিয়ামসনরা আসেন বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ড দল মানে এক ঝাঁক ক্রিকেটারের কার্যকর সমষ্টি। দলের প্রধান যে তারকা, তিনিও তাই বোধ করেন কার্যকারিতার তাগিদ।

তাই উইলিয়াসন হয়ে ওঠেন উদাহরণযোগ্য। সত্যি বললে, নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং প্রতিরোধ মানেই উইলিয়ামসন। যদি জোফরা আর্চার-ওকসরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যা করেছেন সেটা করতে পারেন এই মাচেও এবং শুরুর সেই তোপের কাছে হার মানেন উইলিয়ামসনও, তাহলে বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ।

আবার রয়-বেয়ারস্টোরা যদি ওদের স্বভাবজাত খেলাটা খেলে ফেলতে পারেন নিউজিল্যান্ডের তুখোড় বোলিং সামলে তাহলেও খেলা শেষ। কিন্তু আবার মনে হচ্ছে, তা-ও কি বলা যায়! শেষ হয়ে গেছে, হেরে যাচ্ছে, এমন কত ম্যাচই তো জিতে এলো এবারের দলটা। ওই যে মধ্যবিত্ত!

আওয়াজ দেয় না। চাকচিক্য দেখা যায় না। কিন্তু দিনশেষে ওরা সুখী। সামান্যকে অসামান্য করার নিউজিল্যান্ডের শক্তিই ফাইনালটাকে শেষ পর্যন্ত জমিয়ে রাখবে নিশ্চিত। আর তারপর নতুন চ্যাম্পিয়ন। কত ফাইনালই তো হয়, তার কয়টা শুরুর আগে এমন বোনাস পেয়ে বসে থাকে।

বোনাস পাওয়া ফাইনাল, ঐতিহ্যের লর্ডস, ক্রিকেটের জন্মভূমির শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চ। অভাব নেই মেতে ওঠার অনুষঙ্গের।

কিন্তু আবার ইংল্যান্ড মজে ফুটবলে। নিউজিল্যান্ড রাগবির দেশ। ক্রিকেট তো ওদের কাছে অনাদরের সেছলে।

এসবই সমস্যার কথা। কিন্তু সম্ভাবনার দিকটাও দেখুন। ফাইনাল জিতলে কাপ তো সবাই জিতে। কিন্তু এখানে যে জেতা যাবে আরো অনেক কিছু। ইংল্যান্ডের জয় ক্রিকেটকে উপমহাদেশীয় আপত্তিকর একমুখিতা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

আর নিউজিল্যান্ড জিতলে! ক্রিকেট যে গত কয়েক বছর ধরে ব্যাটের গহ্বরে ঢুকে ‘ক্রিকব্যাট’ খেলা হয়ে যাচ্ছিল এর থেকেও তো ক্রিকেটের মুক্তি।

এই ফাইনাল তাই শুধু ক্রিকেট শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণের ফাইনাল নয়। নয় শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন তৈরির। এ আসলে ক্রিকেটের মুক্তিরও ফাইনাল।