উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা টার্গেট করছে সরকার

দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে বাস্তবায়নে প্রয়োজন বড় অঙ্কের অর্থায়ন। কিন্তু বিশাল অর্থ চাহিদায় বৈদেশিক সহায়তায় তেমন সাড়া নেই; তাই বাড়ছে অভ্যন্তরীণ নির্ভরতা। এক্ষেত্রে জনগণের দেওয়া করই সরকারের অর্থায়নের মূল উৎস।

কিন্তু কয়েক বছরের বাজেটে রাজস্ব যে লক্ষ্য ধরা হয়, তা আদায় করতে পারে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তাই বছর শেষে বড় হয় ঘাটতির অঙ্ক। এ অবস্থার মধ্যেই আগামী অর্থবছরের জন্য ধরা হচ্ছে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা; যার সম্ভাব্য আকার তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।

২০১৯-২০ অর্থবছরের রাজস্বপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সরকারের সাহস জোগাচ্ছে ভ্যাট আইন। কারণ, এ আইন কার্যকরের ক্ষেত্রে আর কালক্ষেপণ করতে চায় না সরকার।

প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকলেও আইনটির কার্যক্রম শুরুর প্রাথমিক ছক তৈরি করেছে এনবিআর। আইনটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের নানান বিষয়ে আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই বিষয়েও একটি সুরাহায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

কারণ, অর্থমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, আইনটি কার্যকর হলে তা যদি ব্যবসা ক্ষেত্রে কোন সংকট তৈরি করে তখন তার যৌক্তিক পর্যালোচনার পর সুরাহা করবে সরকার। শুধু ভ্যাট আইনই নয়, অর্থমন্ত্রী এরই মধ্যে কর কাঠামোতে নানান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; যা আগামী অর্থবছরে কার্যকর হবে।

কত হচ্ছে রাজস্ব বাজেট? আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বা বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে রাজস্ব ব্যয়ের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।

এনবিআরের কর রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ শতাংশ। আর এনবিআরবহির্ভূত কর রাজস্ব পরিমাণ হচ্ছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর কর রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আগামী বছরে ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি আয় করতে হবে।

এনবিআরের আদায় পরিস্থিতি: রাজস্ব আদায়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের ৯ মাসে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এনবিআরের হিসাবে, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুলাই-মার্চ) আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। গত অর্থবছর একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৬ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনবিআর প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

অথচ ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র সাত শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি শুল্ক খাতে। ৯ মাসে শুল্ক আদায় বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ২২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে ৬২ হাজার ৮২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে শুল্ক আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে শুল্ক আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।

এছাড়া গত ৯ মাসে ৭৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৬০ হাজার ১১৯ কোটি টাকা। ৬৩ হাজার ৬৩ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে আয়কর আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা।

ভ্যাট আইন: ১৯৯১ সালে ভ্যাট আইন পাস করে সরকার। পরে সংস্কার করে ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন করা হয়। তবে সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এ আইনটি চালুর কথা ছিল।

কিন্তু ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট হারের পরিবর্তে একাধিক হার করা। তাদের বিরোধিতায় আইনটি কার্যকরের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছেও তা দুই বছরের জন্য স্থগিত করে সরকার।

দুই বছর পর আগামী অর্থবছর অর্থাৎ জুলাই মাসে চালু হবে নতুন ভ্যাট আইন। এবার ব্যবসায়ীদের পরামর্শ মেনেই সাজানো হয়েছে ভ্যাটের স্তর, হার, রেয়াতি সুবিধাসহ পুরো কাঠামো। আগের সিদ্ধান্ত মতো ভ্যাটে হার করা হচ্ছে চারটি।

এগুলো হচ্ছে পাঁচ শতাংশ, সাড়ে সাত শতাংশ, ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ। ভ্যাট আইন কার্যকর হলেও এ আইন বলে, কর আদায়ের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা দরকার তা এখনও অর্জন করতে পারেনি এনবিআর।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্র বা ইসিআর সংযোজন করার ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেই। এ যন্ত্র সরকারের তরফ থেকে দেওয়া হবে, নাকি ব্যবসায়ীরাই কিনবে তারও কোনো নির্দেশনা নেই। কোনো ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ যন্ত্র বসবে, কারা ভ্যাটের আওতায় আসবে তা-ও স্পষ্ট নয়।

কর কাঠামোর সংস্কার উদ্যোগ: নতুন করে কারও ওপর করের বোঝা চাপাতে চায় না সরকার। তবে, কর প্রদানে সক্ষম এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনতে নেওয়া হবে নানামুখী পদক্ষেপ। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, অহেতুক হয়রানি না করে বুঝিয়ে কর আদায় বাড়ানো হবে। করদাতা খুঁজে বের করতে আগামী অর্থবছরে আউটসোর্সিং ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে ১০ শিক্ষার্থী; যারা সারা দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কর সক্ষম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা করবে।

তাদের পরবর্তী সময়ে কর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হবে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে কর অফিস স্থাপন করবে এনবিআর। পাশাপাশি কর দুর্নীতি রোধে দেশের সব বন্দরে পর্যায়ক্রমে বসানো হবে স্ক্যানার। পরীক্ষা ছাড়া কোনো পণ্যই আর দেশ থেকে বাইরে যেতে পারবে না এবং অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, আমদানি-রপ্তানি আড়ালে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়।

রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি: কর রাজস্ব আহরণে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রবৃদ্ধি। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। এনবিআর কর রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। তথ্য বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে কর রাজস্ব আদায়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়।

সেবার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করে সরকার। কিন্তু পরের বছর ২০১২-১৩ বছরে সাত ভাগ কমে কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ১২ দশমিক ৮-এ। তার পরের বছরের চিত্র আরও হতাশাজনক ছিল, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি হয় আট শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয় ১১ শতাংশ। পরের বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের কর আহরণ প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের কর আহরণ প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত ছয় অর্থবছরে এনবিআর কর রাজস্ব আহরণে গড় প্রবৃদ্ধি হয় ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, আয়কর প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাটে) প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, আমদানি শুল্কে প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সম্পূরক শুল্কে গড় প্রবৃদ্ধি হয় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

কর ব্যবস্থা সংস্কার এবং প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, অনেক আইন আছে, তা রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে অন্তরায়। আবার যারা কর আদায় করবে তাদেরও যথেষ্ট দক্ষতা প্রয়োজন। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পুরনো কাঠামো নিয়ে মাঠে নামলে রাজস্ব আদায় করা যাবে না। করদাতাদের কাছে ডিজিটাল ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করতে হবে।