প্রাণ কোম্পানির প্রশংসায় হাইকোর্ট!

বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ গ্রুপের প্রশংসা করেছেন হাইকোর্ট। বাজারে চিহ্নিত মানহীন ৫২ পণ্য নিয়ে শুনানিতে আদালত বলেন, ‘প্রাণ তো অনেক বড় কোম্পানি। সিঙ্গাপুরে গিয়ে প্রাণের পণ্য দেখে অবাক হয়েছি। আমরা প্রাউড ফিল করি যে, প্রাণ আমাদের পণ্য, আমাদের গর্ব।’

বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানির সময় প্রাণের প্রশংসার পাশাপাশি মানহীন পণ্য নিয়ে মন্তব্য করেন।

প্রাণের পক্ষে এ সময় আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী এম কে রহমান। আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন, আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের পক্ষে আদালতে প্রতিবেদন তুলে ধরেন আইনজীবী মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুজ্জামান কচি।

বিএসটিআইয়ের পক্ষে শুনানি করেন সরকার এম আর হাসান মামুন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান।

এছাড়া এসিআইয়ের পক্ষে আইনজীবী রোকন উদ্দিন মাহমুদ, বাঘাবাড়ি ঘি’র পক্ষে মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদী, সান চিপসের পক্ষে ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম শুনানি করেন।

প্রাণ কোম্পানির পক্ষে আইনজীবী এম কে রহমান শুনানিতে বলেন, ‘বিএসটিআই আমার তিনটি পণ্যের বিষয়ে আপত্তি করেছে। কিন্তু আমার সব পণ্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই ওই তিনটি পণ্যের নির্ধারিত ব্যাচ বাদে সব ছাড় চাচ্ছি।’

আদালত বলেন, ‘প্রাণ তো অনেক বড় কোম্পানি। সিঙ্গাপুরে যেয়ে প্রাণ দেখে অবাক হয়ে গেলাম। প্রাণ আমাদের গর্ব। সেই প্রাণের পণ্য যদি আমাদের দেশে এ-রকম হয় তাহলে…।’

এ সময় এম কে রহমান বলেন, ‘বিশ্বের ১৪২টি দেশে প্রাণের পণ্য রফতানি হয়। আদালতের আদেশের পর গোটা বিশ্বে আমাদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। তা-ই তিনটি পণ্য বাদে বাকিগুলোর বিষয়ে আদেশের সংশোধন চাচ্ছি।’

আদালত জবাবে বলেন, ‘বিএসটিআই থেকে নতুন করে পুনঃপরীক্ষার প্রতিবেদন নিন। ছাড়পত্র পেলেই কেবল বাজারে ছাড়বেন।’

এসিআই লবণ নিয়ে শুনানি

গত ১২ মে’র আদেশ সংশোধন চেয়ে এসিআই লবণ কর্তৃপক্ষের পক্ষে ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘ফ্যাক্টরিতে নির্ধারিত তাপমাত্রায় লবণ থাকে। কিন্তু বাইরে দোকানে ও খোলাবাজারে আসার পর তা নির্ধারিত তাপমাত্রায় না থাকায় হয়তো গুণগত মান কমে যায়।’

শুনানির একপর্যায়ে আদালত এসিআই লবণের একটি প্যাকেট দেখিয়ে বলেন, ‘লবণের প্যাকেটের ওপর কী লেখা আছে, কত তাপমাত্রায় তা রাখতে হবে? কিন্তু প্যাকেটে তো তা লেখা নেই যে, মানুষ কত তাপমাত্রায় রাখবে। লবণ কেন নষ্ট হবে? আমরা সবাই লবণ রাখি রান্নাঘরে। রান্নাঘর সবসময় গরম থাকে। আর গরমে যদি লবণের মান নষ্ট হয় তবে…, প্যাকেটে তা লিখে দেননি কেন? এটা লেখা থাকলে তো মানুষ লবন রান্নাঘরে না রেখে ফ্রিজে রাখতো।’

এ সময় ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘সব লবণে তো সমস্যা পায়নি। একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের লবণে সমস্যা পেয়েছে। বাকি ব্যাচের লবণের বিষয়ে আদেশ চাচ্ছি।’

আদালত বলেন, ‘মানুষ কি ব্যাচ দেকে লবণ কেনে? আপনাদের লবণের প্যাকেটের গায়ে বড় করে লেখা আছে, একশভাগ পিওর। আবার লেখা আছে, দুই বছরের মেয়াদ। কিন্তু উৎপাদনের তারিখ লেখা নেই। থাকলেও তা দেখতে সুপারসনিক চোখ লাগবে। আপনি ১০ বছর পরেও যদি দেখেন, তখনও ওই দুই বছর। আর দুই বছরের মেয়াদ আজীবনেও শেষ হবে না। মানুষকে কত রকম ঠকানো যায় তার সব আছে…।’

আদালত আরও বলেন, ‘বিএসটিআই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ৫২টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নিতে, জব্দ করে ধ্বংস করতে এবং এসব পণ্যের উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ বন্ধ করে উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে গত ১২ মে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তাদের দেয়া আদেশ বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে একটি শব্দও নেই। এমনকি দেশের কোনো এলাকার কোনো একটি দোকান থেকে তারা একটি নিম্নমানের পণ্যও তুলে নিতে পারেনি।’

‘ফলে হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী নির্দেশনাগুলো প্রতিপালন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ কেন আনা হবে না, মর্মে রুল জারি করা হলো। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হচ্ছে। এছাড়া আগামী ১৬ জুন আদালতে সশরীরে হাজির হতে বলা হচ্ছে।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের আদেশ বাস্তবায়ন প্রতিবেদনের বিষয়ে আদালত বলেন, ‘আদালতের আদেশ অনুযায়ী তারা যে নির্দেশনাগুলো প্রতিপালন করেছে তা প্রশংসাযোগ্য। আদালতের আদেশ প্রতিপালনে তাদের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি, কেবল এ রমজান মাস উপলক্ষে-ই নয়, সারাবছর তারা তাদের এ অভিযান অব্যাহত রাখবে।’

সম্প্রতি বিএসটিআই ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ৩১৩টি পণ্যের মধ্যে ৫২টি পণ্য মানহীন বলে প্রতিবেদন দেয়া হয়।

রিটকারী আইনজীবীর সম্পূরক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাকি ৯৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফল প্রতিবেদনও আগামী ১৬ জুনের মধ্যে দিতে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে, ৫২টি নিম্নমানের পণ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আদালতের আদেশ সংশোধন চেয়ে আবেদন করলে আদালত তা আমলে নেয়নি।

তবে, ৫২টি নিম্নমানের পণ্যপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের পণ্য বাজারজাত করতে চায় সেক্ষেত্রে বিএসটিআই থেকে পুনঃপরীক্ষা করাতে বলা হয়েছে। তারপর অনুমতি দিলে তারা তা বাজারজাত করতে পারবেন বলেও জানিয়েছেন আদালত। সঙ্গে সঙ্গে বিএসটিআইকে সে পুনঃপরীক্ষার প্রতিবেদন ১৩ জুনের মধ্যে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে আদেশ দেয়ার পর ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আদেশ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল। আদালতে তারা একটি প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে। কিন্তু নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন দেখে আদালত উষ্মা প্রকাশ করেছেন।’

‘কারণ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে ৫২টি নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে জব্দ, সরিয়ে ফেলা বা পণ্য ধ্বংস করে ফেলার বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছুই উল্লেখ করেনি। তাতে আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং তাদের দায়িত্ব অবহেলার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছেন। এমনকি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব করে আদালত বলেছেন, আগামী ১৬ জুন সশরীরে উপস্থিত হওয়ার জন্য।’

রিটকারী আইনজীবী আরও বলেন, ‘আজ আমরা আরেকটি আবেদন নিয়ে গিয়েছিলাম, বিএসটিআইয়ের যে সার্কুলারের ভিত্তিতে আমরা রিটটা দায়ের করেছিলাম, সেখানে বিএসটিআই ক্লেইম করেছিল যে, তারা বাজার থেকে ৪০৬টি পণ্য সংগ্রহ করে টেস্ট করেছে। পরবর্তীতে তারা ক্লেইম করলেন যে, ৩১৩টি পণ্যের ল্যাবটেস্টের ফলাফল পাওয়ার পর ৫২টি পণ্য নিম্নমানের পেয়েছে। এই যে ৩১৩টির বাইরে ৯৩টি পণ্যের ফলাফল যেহেতু জনগণ জানেন না, ভোক্তারা যেহেতু ওই পণ্যগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন, এগুলো কাদের পণ্য, কী পণ্য, এগুলো নিয়মিত ভোগ্যপণ্য কিনা- আবেদনের মাধ্যমে তা আদালতের নজরে এনেছি।’

‘ওই ৯৩টি পণের ল্যাবটেস্ট রেজাল্ট আগামী ১৬ জুন পরবর্তী তারিখে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন পণ্য প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১৩ জুনের মধ্যে বিভিন্ন পণ্য বিএসটিআইকে পুনঃপরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করার জন্য বলা হয়েছে।’

শিল্প মন্ত্রণালয় বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশের পর একটি রিট আবেদনে গত ১২ মে হাইকোর্টের এ বেঞ্চ বিএসটিআইয়ের মানের পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ১৮টি কোম্পানির ৫২টি পণ্য বিক্রি বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে, উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়।

এছাড়া বাজারে থাকা এসব নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে দ্রুত বাজেয়াপ্ত, অপসারণ করে ধ্বংস এবং মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এর উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ বন্ধ রাখতেও নির্দেশ দেয়া হয়।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে এসব নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

শিল্প মন্ত্রণালয় গত ২ মে সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের জানায়, বিএসটিআই রোজার আগে বাজার থেকে ৪০৬টি পণ্য পরীক্ষা করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫২টি নিম্নমানের পণ্য চিহ্নিত করেছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিসও পাঠানো হয়েছে এবং অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানান।

এরপর এসব খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার, জব্দ ও মান উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে গত ৮ মে ভোক্তা অধিকার সংগঠন- কনশাস কনজ্যুমার সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী সম্পাদকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান রিট আবেদনটি করেন।

এর আগে আদালতের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মানহীন ৫২ পণ্য ঢাকার দোকান থেকে প্রায় উঠিয়ে নেয়া হয়। বিক্রেতারা জানান, আদালতের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে তারা পণ্যগুলো বিক্রি করছেন না, আবার কোম্পানিগুলোও সেগুলো তুলে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানের লোকজন।