কেন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ জীবনের পেছনে ছুটছে হাজার হাজার বাংলাদেশি?

অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নৌকায় করে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার মরিয়া চেষ্টার কারণে বেশিরভাগ নৌকাডুবি ঘটছে।

মধ্য ভূমধ্যসাগরে গত কয়েক বছরের নিয়মিত দৃশ্য এটি। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ হয়েছেন ৩৯ জন বাংলাদেশি।

ইউরোপ-আমেরিকায় অভিবাসনের হাতছনি এতোটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুও পরাজিত হয়ে যায় তার কাছে।

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন আমিনুল ইসলাম নামের একজন প্রবাসী।

তার স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-

‘ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা আপনার বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের সুন্দর ছবি দেখে আপনারও নিশ্চয় বড্ড আলো-ঝলমলে বিদেশ জীবন পাবার ইচ্ছে হয়।

বিদেশের জীবনটা কি আসলেই এতোটা আলো-ঝলমলে রঙিন? বোধকরি আমরা যারা বিদেশে থাকি, এদের দায়টাই বেশি। আমরা এমন একটা ভাব করি- বিদেশে থেকে কি সুখেই না আছি!

আচ্ছা, আপনারা যারা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকেন, আপনারা কি আপনাদের প্রবাস জীবনে আসলেই সুখী? তাহলে আমি যে এতো এতো গবেষণা রিপোর্ট পড়লাম, সেগুলো কি সব মিথ্যে?

সেখানে তো বলা হচ্ছে- বেশিরভাগ প্রবাসী কিংবা মাইগ্রেন্ট তাদের বিদেশ জীবন নিয়ে সুখী না, নানা মানসিক সমস্যায় ভোগে এবং জীবনের একটা বিশাল এবং লম্বা সময় পর্যন্ত নানান বর্ণ বৈষম্যের মাঝ দিয়ে যায়!

এরপরও এতো আলো-ঝলমলে জীবনের একটা ছবি কেন আপনারা দেশে থাকা মানুষগুলোকে দেখান?

গবেষণা রিপোর্টের কথা বাদই দিলাম। আমি নিজেই তো ১৭ বছর ধরে বিদেশে আছি।

আমি কি সুখী?

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আমি কেন দেশে ফেরত যাচ্ছি না। সে এক ভিন্ন আলোচনা। সেই আলোচনা’য় এই লেখায় যেতে চাইছি না। এই যে আপনারা ইউরোপ-আমেরিকায় থেকে সুন্দর একটা রেস্টুরেন্টে খেতে বসে ছবি আপলোড করেন ফেসবুকে, কিংবা চমৎকার একটা বাসার ড্রইং রুমের আড্ডার ছবি দেন; আপনার জীবন কি আসলে এমন? আপনারা কি আদৌ এতো আনন্দের আর সুখী জীবন কাটান?

নাকি সপ্তাহের ছয় দিন হোটেল-রেস্টুরেন্টে হাড় ভাঙা খাটুনি খেটে, চারপাশের অন্য সহকর্মীদের বকা-ঝকা শুনে, আর কবে দেশে যাবো, দেশের বন্ধু-বান্ধব, পরিবার আর বর্ষার ঝনঝনানি শব্দ কিংবা কুয়াশা ঢাকা মেঠো পথের কথা মনে করতে করতে আপনাদের জীবন পার করেন? তাহলে কেন আপনারা বিদেশের জীবনের এই মিথ্যে সুখের ছবি তুলে ধরেন?

এই যে দুই দিন আগে ৩৯ জন মানুষ নৌকায় করে ইউরোপে ঢুকতে চাইল, রঙিন জীবনের আশায়; তাদের মৃত্যুতে কি আপনাদের একটুও দায় নেই?

এরা হয়ত আপনাদের এই সব মিথ্যে রঙিন জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে যে করেই হোক ইউরোপে আসতে চেয়েছিল। হয়ত ভেবেছিল যে করে হোক ইউরোপে ঢুকলেই জীবন রঙিন!

আসলেই কি তাই?

এরপর যে কি কঠিন জীবন অপেক্ষা করছে, সেটা কি আপনারা কখনও তাদের বলেছেন?

বলবেন কেন?

আপনি নিজে তো এখানে লেবারের কাজ করছেন কিংবা রেস্টুরেন্টে বসে পেঁয়াজ কাটছেন; আর দেশে গিয়ে এই আপনিই আবার রেস্টুরেন্টে কাজ করা ছেলেটাকে তুই তুকারি করে বলছেন- ব্যাটা কাজ পারিস না!

শত হোক ইউরোপ ফেরত বলে কথা! রেস্টুরেন্ট বয়কে তো যা ইচ্ছে তাই বলাই যায়! যেই ৩৭ জন মানুষ ডুবে মারা গেল, এরা প্রত্যেকেই দালালদের ৮-১০ লাখ টাকা দিয়েছিল।

এই টাকায় চাইলেই দেশে খুব সহজেই কিছু একটা করা যেত। বিদেশে আমরা যেই পরিশ্রম করি, সেই পরিশ্রমের অর্ধেক করলেও দেশে খুব ভালো ভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব।

সমস্যা হচ্ছে, যারা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকে, এরা আপনাদের সঠিক ছবিটা দেয় না! এরা এমন একটা ছবি আপনাদের সামনে তৈরি করেছে, দেখে মনে হবে- আহা কতো সুখ ইউরোপে!

আর পরিবার-পরিজনের কথা ভেবে নিজের জীবন বাজি রেখে ইউরোপে ঢুকতে চাইছেন?

আপনাদের জানিয়ে রাখি, সপ্তাহ দুয়েক আগে সাইপ্রাসে এক বাংলাদেশি অবৈধ ভাবে ঢুকে সেখানে মারা গেছে। তার ভাই-বোন ইটালিতে থাকে অনেক দিন ধরে। সে নিজেও ইটালিতে যেতে চাইছিল।

তার মৃত্যুর পর তার আপন ভাই-বোন, তার মরদেহ নিতে রাজি হয়নি। কারণ মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে অনেক খরচ।

নিজের জীবন নিয়ে আগে ভাবুন। নিজে বাঁচলেই কেবল অন্যদের নিয়ে চিন্তা করা যাবে। আর বিদেশের যেই মিথ্যে রঙিন জীবন ইউরোপে-আমেরিকায় বসে আমরা প্রবাসীরা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করি, জেনে রাখুন- ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে সেটা স্রেফ লোক দেখান রঙিন জীবন। বাস্তবতা হচ্ছে- কেবলই ধূসর!’