ঘূর্ণিঝড় ফণী: শুরু থেকে শেষ

মধ্যরাতের পরে যে কোনো সময় আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় ফণী। জানা গেছে ফণী যত এগুবে তত শক্তি হারাতে থাকবে। ঝড়ের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিচু অঞ্চলগুলো প্লাবিত হতে পারে। বৃষ্টি হবে অনেক। ঝড়ো বাতাসে কাঁচা ঘরবাড়ি কিছু নষ্ট হতে পারে। ঝড়ো বাতাসে এবং জমি প্লাবিত হওয়ায় অনেক জায়গায় ফসল নষ্ট হবে।

মারাত্মক কোনো বিপদের আশঙ্কা না থাকলেও মধ্যরাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে বহু মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ঢোকার পর ফণী কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর হয়ে ঝড়টি শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ ভারতের মেঘালয়ে ঢুকে যাবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশে আবহাওয়া বিভাগের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ।

ফণী বাংলাদেশে ঢোকার পর বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। সাথে থাকবে দমকা ঝড়ো বাতাস। তবে যত সময় যাবে, বৃষ্টি এবং বাতাসের তীব্রতা কমতে থাকবে।

রোববার নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে শুক্রবার (৩ মে) সকাল থেকে বাংলাদেশের বহু জায়গায় কম-বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে সাত নম্বর বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছে। তাছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত এবং কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে যাতে স্বল্প সময়ের নোটিশে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে তাদের গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলা হয়েছে।

এমতাবস্থায় ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কারারক্ষীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে জরুরি আদেশ জারি করেছে কারা অধিদপ্তর।

কারা মহাপরিদর্শকের পক্ষে সহকারী কারা মহপরির্দশক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, ‘দেশের সব কারাগারে বিশেষত: সমুদ্র উপকূলবর্তী কারাগারে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ করত: যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ করা হলো।’

আদেশে আরেও বলা হয়েছে, পাহারা দায়িত্ব পালনকারী কারারক্ষীদের সতর্ক অবস্থানে থেকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ঘূর্ণিঝড় পূর্ববর্তী ও পরবর্তি সব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবহাওয়া বিভাগ জানায়, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার যা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

এরই মধ্যে ঘূর্ণিঝড় ফণী’র প্রভাবে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার (৩ মে) সকাল থেকে বলেশ্বর নদীর পানি বৃদ্ধি ও স্রোতের চাপে উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/১ বোল্ডারের বেড়িবাঁধ ভেঙে বগী, সাতঘর এলাকার লোকালয়ে পানি ঢুকে ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে।

এমতাবস্থায় অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্তান-সন্ততি ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতির অবনতি হলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ারও প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।

এছাড়া ফণীর প্রভাবে সাতজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুন্দিয়ার তিনজন, মিঠামইনের দুইজন, ইটনার একজন এবং বাগেরহাটের একজন রয়েছেন।

নিহতরা হলেন- পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের কুর্শাকান্দা গ্রামের আয়াজ আলীর ছেলে আসাদ মিয়া (৫৫), একই উপজেলার চরফরাদি ইউনিয়নের আলগীরচর গ্রামের আবদুল হালিমের মেয়ে নুরুন্নাহার (৩০), একই এলাকার এন্তাজ আলীর ছেলে মুজিবুর (১৭), মিঠামইন উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের বিরামচর গ্রামের গোলাপ মিয়ার ছেলে মহিউদ্দিন (২৩), একই উপজেলার কেওয়াজোড় ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামের এবাদ মিয়ার ছেলে সুমন মিয়া (৭), ইটনা উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের কাটুইর গ্রামের রাখেশ দাসের ছেলে রুবেল দাস (২৬)। বাগেরহাটের শাহানুর বেগম।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, প্রবল শক্তি সঞ্চয়কারী ফণী ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ২৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ১ হাজার ১৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

গত রোববার (২৮ এপ্রিল) ফণীর অবস্থান ছিল বাংলাদেশ থেকে দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে। সোমবার ছিল ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের মছলিপত্তনম থেকে ১,০৯০ কিলোমিটার এবং চেন্নাইয়ের দক্ষিণ-পূর্ব থেকে ৮৮০ কিলোমিটার দূরে।

বাংলাদেশের তরফেই ঘূর্ণিঝড়টির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফণী’। ‘এক্সট্রিমলি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’-এ পরিণত হচ্ছে ঝড়টি।

এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের সময় সচেতন থাকার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে অনেক বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপদ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

ঝড়ের সময় যা করা উচিত

১। সবার আগে যেটা জরুরি তা হল প্যানিক না করা। মাথা ঠাণ্ডা রেখে বিপদের মোকাবিলা করতে হবে।

২। প্রবল ঝড়ে উড়ে যেতে পারে এমন বস্তু খোলা জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। যেমন আলগা হয়ে যাওয়া ইট, টিন, ময়লার বাক্স, সাইন বোর্ড ইত্যাদি। কারণ দমকা হাওয়ায় এই সব উড়ে গিয়ে কোনও বিপদ ঘটাতে পারে।

৩। হাতের সামনে কাঠের বোর্ড রাখতে হবে। কাঠ বিদ্যুত অপরিবাহী।

৪। লন্ঠন বা হ্যারিকেন এবং টর্চ হাতের কাছে রাখতে হবে।

৫। বাড়িতে খাবার মজুত করে রাখতে হবে। বিশেষ করে নষ্ট না হয় এমন শুকনো খাবার। সব পাত্রে পানীয় জল ভরে রাখতে হবে।

৬। প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত করে রাখতে হবে। ফার্স্ট এড বক্স হাতের কাছে রাখতে হবে।

৭। ঝড়ের সময় বাড়িতেই থাকা ভালো। বাড়ির এমন এক জায়গা বেছে নিতে হবে যেখানে নির্ভয়ে থাকা যায়।

৮। কাঁচের জানলা থাকলে আগে থেকে তাতে শক্ত করে বোর্ড জাতীয় কিছু ঝুলিয়ে দিতে হবে। না হলে জানলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৯। বাড়ির একতলায় যদি মিটার বক্স থাকে তাহলে ইলেকট্রিকের তার ঠিক আছে কিনা দেখে নিতে হবে। অনেক সময় মিটারের তার ঝুলে সেখান থেকে বিপত্তি ঘটে যেতে পারে।

১০। পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে হবে আর কোন ধরনের গুজবে কান দেওয়া যাবে না।

ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী করণীয়

১. আশ্রয়কেন্দ্র হতে মানুষকে বাড়ি ফিরতে সাহায্য করুন এবং নিজের ভিটায় বা গ্রামে অন্যদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিন।

২. রাস্তা-ঘাটের উপর উপড়ে পড়া গাছপালা সরিয়ে ফেলুন যাতে সহজে সাহায্যকারী দল আসতে পারে এবং দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হয়।

৩. ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ যাতে শুধু এনজিও বা সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজে যেন অন্যকে সাহায্য করে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে।

৪. অতি দ্রুত উদ্ধার দল নিয়ে খাল,নদী,পুকুর ও সমুদ্রে ভাসা বা বনাঞ্চলে বা কাদার মধ্যে আটকে পড়া লোকদের উদ্ধার করুন।

৫. ঝড় একটু কমলেই ঘর থেকে বের হবেন না। পরে আরও প্রবল বেগে অন্যদিক থেকে ঝড় আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

৬. রিলিফের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সচেষ্ট হোন। রিলিফের পরিবর্তে কাজ করুন। কাজের সুযোগ সৃষ্টি করুন। রিলিফ যেন মানুষকে কর্মবিমুখ না করে কাজে উৎসাহি করে সেভাবে রিলিফ বিতরণ করতে হবে।

৭. দ্বীপের বা চরের নিকটবর্তী কাদার মধ্যে আটকে পড়া লোকদের উদ্ধারের জন্য দলবদ্ধ হয়ে দড়ি ও নৌকার সাহায্যে লোক উদ্ধার কর্মআরম্ভ করুন। কাদায় আটকে পড়া লোকের কাছে দড়ি বা বাঁশ পৌঁছে দিয়ে তাকে উদ্ধার কাজে সাহায্য করা যায়।

৮. পুকুরের বা নদীর পানি ফুটিয়ে পান করুন। বৃষ্টির পানি ধরে রাখুন।

৯. নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ লোকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় ত্রাণ বন্টন (আলাদা লাইনে) করুন।

১০. দ্রুত উৎপাদনশীল ধান ও শাক-সব্জির জন্য জমি প্রস্তুত করুন,বীজ সংগ্রহ করুন এবং কৃষি কাজ শুরু করুন যাতে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফসল ঘরে আসে।

প্রসঙ্গত, তিন যুগের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণী। ১৯৪৩ সালের পর এতো শক্তিশালী ঝড় আর কখনো দেখা যায়নি।