ফখরুল ছাড়া বাকীদের শপথ ঠেকাতে পারবে বিএনপি?

বাংলাদেশে বিরোধীদল বিএনপির নির্বাচিতদের যারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন, তাদের বিরুদ্ধে দলটি বহিষ্কারের মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আদালত পর্যন্ত যাওয়ার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। খবর: বিবিসি বাংলা।

দলটির নির্বাচিত ছয় জনের মধ্যে একজন ইতিমধ্যে শপথ নেয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বিএনপির নেতারা বলছেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া নির্বাচিত অন্যদের শপথ নেয়া ঠেকানো যাবে কিনা, তা নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তারা আরও বলেছেন, কঠোর অবস্থান নিলেও এই ইস্যুতে তাদের দল একটা নতুন সংকটে পড়েছে।

ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির জাহিদুর রহমান দু’দিন আগে শপথ নেয়ার পর বলেছিলেন, তিনি তার দলের বাকিদের সংসদে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বাকি চারজনের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তারা সংসদে যাওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়ে আছেন। কিন্তু এর পরিণতি কি হবে, এ নিয়ে তারা শলাপরামর্শ করছেন ব্যক্তিগতভাবে।

সবার শপথ নেয়া ঠেকানো যাবে, সেই আশা বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও এখন ছেড়ে দিয়েছেন। সেজন্য তারা সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে দলীয় আইনজীবীদের সাথেও আলোচনা করছেন। তারা এমন অভিযোগও করছেন যে, শপথ নেয়ার জন্য সরকারের দিক থেকে নির্বাচিতদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে সরকার সেই অভিযোগ অস্বীকার করছে।

বিএনপি তাহলে কি করবে? দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কেউ সংসদে গেলে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার অভিযোগে তারা ব্যবস্থা নেবেন। এখন পর্যন্ত আমাদের শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত আছে। এতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সুতরাং দলীয় সিদ্ধান্ত যদি লোক অমান্য করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, আমরা প্রথমেই বলেছি, যে নির্বাচন হয়নি। যে নির্বাচনের ফলাফল আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, সেই সংসদে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, তাকে বৈধ করা। সেটা আমরা করতে চাই না।

শেষ পর্যন্ত সংসদে না যাওয়ার পেছনে বিএনপির যুক্তি কি? বিএনপি নেতারা এই সংসদে না যাওয়ার পিছনে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের যুক্তি সামনে আনছেন। এছাড়া দলটির নেতাদের অনেকে বলেছেন, জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধীদল হিসেবে সংসদে বসানো হয়েছে। সেটিও বিএনপি মেনে নিতে পারেনি। ফলে দলটি শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্তেই শেষ পর্যন্ত অটল থাকছে।

তবে বিএনপির তৃণমূলের এবং মধ্যম সারির নেতা কর্মীদের অনেকের মাঝে একটা ধারণা জন্মেছিল যে, তাদের দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সংসদে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে একটা ইস্যু হতে পারে। কিন্তু তাদের নেত্রীর মুক্তির প্রশ্নে সরকার কোনো সাড়াই দেয়নি।

বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেত্রী শামা ওবায়েদ মনে করেন, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে সংসদে যাওয়া যাবে না, এই বিষয়টি তাদের সব পর্যায়ে নেতা কর্মিদের মধ্যে কাজ করছে। সেজন্য যারা শপথ নিচ্ছে, তাদের নিয়ে দলে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, যারা যাচ্ছে, তারা ব্যক্তিগতভাবে যাচ্ছে। এটা দলের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করা হয়। বিষয়টি দলের জন্য নেতিবাচক হয়। কিন্তু আমাদের তৃণমূল থেকে সব পর্যায়ে একটা সেন্টিমেন্ট আছে যে আমাদের নেত্রী কারাগারে। সে কারণে দলের কেউ চায় না যে নির্বাচিতরা সংসদে যাক। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির একজন নেত্রী নার্গিস আলম চৌধুরী বলছিলেন, যারা শপথ নেবে, তারা দলকে নতুন করে সংকটে ফেলছে।

আইনি লড়াইয়ে কি সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে? শপথ নেয়ার কারণে বিএনপি জাহিদুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। দলটি তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের জন্য আইনি লড়াই করার কথা জানিয়েছে। কিন্তু তাতে কি ফল হবে, সে ব্যাপারেও দলটির নেতারা নিশ্চিত নন।

অন্যতম একজন সংবিধান বিশেষঞ্জ ড: শাহদীন মালিক বলছিলেন, এ ধরণের ঘটনায় সংসদ সদস্য পদ বাতিলের ব্যাপারে সংবিধানের সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদের মর্মার্থ ছিল যে, কেউ একটা দলের হয়ে নির্বাচনে গিয়ে সংসদ সদস্য হয়ে যেনো ঐ দলের বিরুদ্ধে না যান। আর এই বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নে ৭০ অনুচ্ছেদে দুইটা উদাহরণ দেয়া আছে, একটা হলো দল থেকে পদত্যাগ করলে, আরেকটা হলো দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সেটা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া বোঝায়।

কিন্তু বিএনপি জাহিদুর রহমান শপথ নিয়েছেন ঐ দলের সদস্য হিসেবেই। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেননি। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ড: শাহদ্বীন মালিক বলেছেন, আমার মতে, ৭০ অনুচ্ছেদের মুল উদ্দেশ্য হলো, কেউ কোন দল থেকে নির্বাচিত হলে সে যেনো ঐ দলেই থাকে। এই আলোকে যদি এর ব্যাখ্যা আসে, তাহলে সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা।

একইসাথে তিনি বলেছেন, মুল কথা হলো, কোন পরিস্থিতিতে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যপদ যাবে বা যাবে না, এ ধরণের ঘটনার নজির আমাদের খুবই কম। আইনজীবীরা আরও জানিয়েছেন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর সপ্তম সংসদে বিএনপির নির্বাচিত দু’জন সংসদ সদস্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাদের সদস্য পদ বাতিলের বিষয় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কিন্তু কোন ফলাফল আসার আগেই ঐ সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল।