হাকালুকির কান্না

এ হাওর বছরের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শীত মৌসুমে হাওরের দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো সত্যিই দৃষ্টিনন্দন।



হাকালুকি। এই একটি মাত্র শব্দের সঙ্গে যে মিশে আছে কত শত সাতকাহন আর মানুষের জীবন-সংগ্রামের গল্প তার কোনো হিসাব নেই। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই হাওরকে ঘিরে নির্বাহ করেন তাদের জীবন-জীবিকা। এই হাওরের সঙ্গে তাই তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে। এই জলাভূমি এশিয়ার অন্যতম জলজ নিদর্শন। সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫টি উপজেলায় বিস্তৃত এই হাকালুকি ছোট-বড় প্রায় ২৩৮টিরও বেশি বিল ও ছোট-বড় ১০টি নদী নিয়ে গঠিত, বর্ষাকালে যার আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত হয়। এই হাওরে বাংলাদেশের মোট জলজ উদ্ভিদের অর্ধেকেরও বেশি এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটাপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি পাওয়া যায়। বলা বাহুল্য, হাকালুকি হাওর পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নের জন্য একটি অমিত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
  
এ হাওর বছরের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শীত মৌসুমে হাওরের দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। বিলের জলের মাঝে ও চারধারে জেগে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া কিঞ্চিত উঁচুভূমি বিলের জলে প্রতিচ্ছবি ফেলে সৃষ্টি করে অপরূপ দৃশ্য। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় হাওরের জলরাশির মাঝে সূর্যের প্রতিচ্ছবি সত্যই দৃষ্টিনন্দন ও মনোমুগ্ধকর। শীতকালে হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সমৃদ্ধ করে বিভিন্ন ধরনের অতিথি পাখি।
  
হাওরের অনিন্দসুন্দর এই প্রাকৃতিক রূপের বাইরে আছে একটি মনুষ্যসৃষ্ট বীভৎস ও কুৎসিত দৃশ্যপট। গেল বেশ কয়েক দশক থেকে এ হাওরকে ঘিরে চলছে প্রভাবশালী অসৎ চক্রের তৎপরতা। ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছে হাকালুকি হাওরের ৮টি মৎস্য অভয়াশ্রম তৈরি নিয়ে। শীত মৌসুমে অভয়াশ্রম তৈরির কথা থাকলেও এখনও কাজ শুরুর কোনো প্রক্রিয়া নেই। জানা গেছে, ২৩৮টি বিলসম্পন্ন হাকালুকি হাওরে ১৮টি মৎস্য অভয়াশ্রম তৈরির অনুমোদন দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৮টি অভয়াশ্রম তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়। ৮টি অভয়াশ্রমের মধ্যে গৌরাঙ্গ বিল, মালাম বিল ও কাংলি গোবরকুড়ি বিলের অভয়াশ্রম তৈরির দায়িত্ব বর্তায় উপজেলা পরিষদের অন্তর্ভুক্ত মৎস্য বিভাগের ওপর। প্রতিটি অভয়াশ্রম তৈরির জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত হয় ৬৭ লাখ টাকারও বেশি।

খবর নিয়ে জানা গেছে, অভয়াশ্রম তৈরির জন্য বিল খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ঢিমেতালে মাটি খননের ফলে খনন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়েছে বারবার। যতটুকু বিল খননের কথা ছিল ততটুকু সম্ভব হয়নি। বড়লেখা উপজেলার অধীন মালাম বিলে ৬০ শতাংশ এবং জুড়ী উপজেলার অধীন গৌরাঙ্গ বিলে ৩৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে একটি সূত্র দাবি করছে। কুলাউড়া উপজেলার অধীন কাংলি গোবরকুড়ি বিলে অভয়াশ্রম নির্মাণের কথা থাকলেও এখানে কোনো কাজ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া হাকালুকির বিভিন্ন বিলে আসা অতিথি পাখিদের বিষটোপ দিয়ে নির্বিচারে চলে পাখি শিকার। এসব দেখার যেন কেউ নেই! যাদের দেখার কথা সেই প্রশাসন নির্বিকার। একশ্রেণীর অসাধু পাখি শিকারি ও প্রভাবশালী ব্যক্তির ছিঁটানো বিষটোপ আর পাতানো ফাঁদে ধরা পড়ছে হাজার হাজার অতিথি পাখি। ফলে প্রতিবছরই অতিথি পাখির সমাগম কমছে। বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির দেশী-বিদেশী পাখিও।
  
হাকালুকি হাওরকে সরকার ১৯৯৯ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০০৩ সালে পরিবেশ অধিদফতরের অধীনে উপকূলীয় ও জলাভূমি জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের (সিডব্লিউবিএমপি) আওতায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে হাওর উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে সমাজভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় আরও ৬ কোটি টাকার প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়। ২০০৪ সাল থেকে এ প্রকল্পের অধীনে হাওরের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। বিগত ৬ বছরে এ প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও হাওর নিয়ে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে তাদের প্রজেক্ট শেষ হওয়ায় পরিবেশ অধিদফতরের কুলাউড়া অফিসের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
  
হাকালুকির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। অরক্ষিত হয়ে পড়েছে মিঠা পানির বৃহৎ এই মৎস্য ভাণ্ডারটি। হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, প্রকল্প অব্যাহত থাকলে তা আরও উপকৃত হবে। তবে হাওরের প্রকল্পের নামে কিছু এনজিও শুধুই লোক দেখানো কাজ করছে। তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
  
বিল সেচ করে প্রতিবছর মাছ ধরার প্রক্রিয়ায় গত ২০ বছরে হাকালুকি হাওর থেকে ২৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ অবস্থায় এ হাওরে অন্তত ২৫টি মৎস্য অভয়াশ্রম তৈরির দাবি উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। হাওরপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের জোর দাবি, হাকালুকি হাওর যাতে সরকারের বরাদ্দের অভাবে বিলীন হয়ে না পড়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। 

শরীফ আহমেদ : সাংবাদিক
Join us
Join us
নাম

অপরাধ সংবাদ অর্থনীতি আইন-কানুন আন্তর্জাতিক ইসলাম এক্সক্লুসিভ কৃষি তথ্য ক্যাম্পাস খেলাধুলা গণমাধ্যম চাকরির খবর জাতীয় নগর-মহানগর পশু-পাখি পাঁচমিশালী প্রচ্ছদ প্রবাস ফিচার ফেসবুক কর্ণার বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন ভ্রমণ মুক্তমত রাজনীতি রাশিফল রেসিপি লাইফস্টাইল শিক্ষাঙ্গণ শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ সাহিত্য
false
ltr
item
হাকালুকির কান্না
এ হাওর বছরের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শীত মৌসুমে হাওরের দিগন্ত বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বিলের কান্দিগুলো সত্যিই দৃষ্টিনন্দন।
https://3.bp.blogspot.com/-BPSVncNKRQM/V6AcG1s4_6I/AAAAAAAAIf0/yG8QsUA1D58yZIKL9P-3MwagTs_9ZZjPwCLcB/s640/%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B2%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BF.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-BPSVncNKRQM/V6AcG1s4_6I/AAAAAAAAIf0/yG8QsUA1D58yZIKL9P-3MwagTs_9ZZjPwCLcB/s72-c/%25E0%25A6%25B9%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25B2%25E0%25A7%2581%25E0%25A6%2595%25E0%25A6%25BF.jpg
bdview24.com | Bangla News Portal - বাংলা নিউজ পেপার
https://www.bdview24.com/2016/08/news_72.html
https://www.bdview24.com/
https://www.bdview24.com/
https://www.bdview24.com/2016/08/news_72.html
true
6262954174861801074
UTF-8
Not found any posts সব দেখুনL বিস্তারিতঃ- Reply Cancel reply Delete By হোম পেইজ পোস্ট সব দেখুন একই রকম পোস্ট বিষয় আর্কাইভ শেয়ার সব খবর Not found any post match with your request ব্যাক টু হোম রবিবার সোমবার মঙ্গলবার বুধবার বৃহস্পতিবারর শুক্রবার শনিবার রবিঃ সোমঃ মঙ্গঃ বুধঃ বৃহঃ শুক্রঃ শনিঃ জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মার্চ এপ্রিল মে জুন জুলাই আগস্ট সেপ্টেম্বর অক্টোবর নভেম্বর ডিসেম্বর জানুঃ ফেব্রুঃ মার্চ এপ্রিঃ মে জুন জুলাঃ আগস্ট সেপ্টেঃ অক্টোঃ নভেঃ ডিসেঃ এই মুহূর্তে ১ মিনিট আগে $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy