সিদ্ধিরগঞ্জে ২৭ কুতুবের ‘গডফাদার’ ছিলেন নুর হোসেন

হেন কোন কাজ নেই তারা করেনি। চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে খুন, অপহরণ, দখল, নির্যাতন, পঙ্গু-জখম, মিথ্যা মামলায় পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করানো সবই তারা করতো নির্বিঘেœ।

কারণ তাদের ওপর ছিল নুর হোসেনের ছায়া। থানা পুলিশ এদের বিরুদ্ধে মামলাও নিতো না। নুর হোসেনের নির্দেশ এরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো। নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের পর একের পর এক বেরিয়ে আসছে নুর হোসেন বাহিনীর অপরাধের চাঞ্চল্যকর কাহিনী।

সিদ্ধিরগঞ্জে স্থানীয় লোকজনের মুখ থেকে জানা যায়, সেভেন মার্ডার মামলার প্রধান অভিযুক্ত নুর হোসেন বাহিনীর ২৭ সদস্যরা হলেন মুজিবুর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, হাবিবুল্ল¬াহ হবুল, সাদেকুর রহমান সাদেক, সামসুল আলম, লোকমান পাটোয়ারী, মতিউর রহমান মতি, তাজিম বাবু, হাসমত আলী হাসু, আবুল কালাম ওরফে হিটলার কালাম, কিলার সেলিম, ফরহাদ দেওয়ান, লোকমান মেম্বার, জসিম উদ্দিন ভুঁইয়া জসিম, আমির হোসেন ভান্ডারী, আরিফুল হক হাসান, টোকাই শাহজাহান, সানাউল¬াহ সানা, আলী মোহাম্মদ, জামাল উদ্দিন জামাল, শাহ আলম হীরা, বড় হযরত, ছোট হযরত, রফিকুল ইসলাম রতন (আটক), মিজানুর রহমান মিজান, রিয়াদ (নুরের গানম্যান) ও জিতু। এদের মধ্যে অনেকে সেভেন মার্ডার মামলার আসামী।

২৭ কুতুবের কে কোন কাজে : সাদেকুর রহমান সাদেক কুমিল্লার স্থায়ী বাসিন্দা। আদমজী জুট মিলের শ্রমিক নেতার সুবাদে এখন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। নুর হোসেনের উত্থানে রাজনৈতিক গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক কয়েক নেতার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিতরণের দায়িত্ব ছিল তার। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি পদ নিয়ে দেয়ার বিপরীতে নুর হোসেনের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছিলেন (সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে খুশি করতে) এই সাদেক। নুর হোসেনের যে কোনো অপরাধেই রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজের দায়িত্ব ছিল তার। সম্প্রতি ৭ অপহরণ ও খুনের ঘটনার পর ১২ দিন আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। দলের উচ্চ পর্যায়ের ‘সবুজ সংকেতে’ এখন তিনি সিদ্ধিরগঞ্জে।

লোকমান পাটোয়ারী ওরফে মুহুরী লোকমান। চাঁদপুরে জন্ম গ্রহণকারী লোকমান এখন ঢাকার অভিজাত এলাকার বাসিন্দা। বিলাসবহুল গাড়িতে চেপে প্রতিদিনই ঢাকা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জে যেতেন। নুর হোসেনের ‘আইন কর্তা’ তিনি। মাসে বেতন নিতেন ৫ লাখ টাকা। সব ধরনের মামলা তদারক করতেন লোকমান। অফিস করতেন নুর হোসেনের দখল করা কাসসাফ মার্কেটের দোকানে। এডভোকেট না হয়েও এ আইনকর্তা কার বিরুদ্ধে কী ধারায় মিথ্যা মামলা করতে হবে, মামলার ভয় দেখিয়ে কাকে কীভাবে হুমকি দিতে হবে কোন মামলার কী তদবির, খালাস, অগ্রিম রিট করে অশ্ল¬ীল যাত্রার অনুমতি নেয়াসহ আইনি ক্ষেত্রের অবৈধ সব কর্মকা- পরিচালনার কুপরামর্শ দিয়েছেন লোকমান। মাসে বেতন নেয়ার পাশাপাশি অপকর্মের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়েছেন তিনি। এই লোকমানের পরামর্শে সিদ্ধিরগঞ্জ ফতুল¬ার কয়েকশ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় ও এলাকা ছাড়া করেছে নুর হোসেন বাহিনী।

হাবিবুল্ল¬াহ টাওয়ারের মালিক ও আহসানউলল্লাহ সুপার মার্কেটের পরিচালক হাবিবুল্ল¬াহ হবুল। নুর হোসেনের ব্যবসায়িক পার্টনার। আঁটি গ্রামের এ বাসিন্দা সিদ্ধিরগঞ্জের ১নং ও ৪নং ওয়ার্ডের সরকারি-বেসরকারি জমি দখলে নুর হোসেনের অন্যতম সহযোগী। নূরের অবৈধ আয়ের মোটা একটা অংশ ১২ তলা হাবিবুল্ল¬াহ টাওয়ারে লগ্নি করা আছে। তার পরামর্শে সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিংয়ের অপজিটে ৪ বিঘা সরকারি জমি দখলে নিয়েছে নুর।

থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান ও সেক্রেটারি ইয়াসিন আলীও (সম্প্রতি বহিষ্কৃত) রাজনৈতিক কুতুবের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ, বিচার-সালিশে নুরের অবৈধ কাজের পক্ষ নেয়াসহ দখল, চাঁদাবাজির বুদ্ধিদাতা। তাদের বৈঠকের অফিসও সরকারি জমির ওপর। এক সময়ের সিদ্ধিরগঞ্জ পুলে অবস্থিত জাগরণী সংসদকে তারা গোপন বৈঠকের কেন্দ্র করে রেখেছেন। সাজানো-গোছানো এ অফিসটিতে প্রায়ই বসে বিভিন্ন অপরাধের সিদ্ধান্ত নিতেন নুর হোসেন। রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করার দায়িত্ব দিতেন তাদের।

এ অফিস থেকেই মিজমিজির মুজিববাগ গ্রামের যুদ্ধাহত পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক রেফারির বাড়ি দখলের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হার্টঅ্যাটাকে মারা গেলে ওই রাতেই ডাকাতি করা হয়।

২০০৪ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে শাহাবুদ্দিনকে (৩৫) চিটাগাং রোডে সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রকাশ্যে গুলী করে হত্যা করা হয়। এরপর উচ্ছেদ ও মুত্যুর হুমকি দিয়ে সশস্ত্র হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে দখল করা হয় ৩ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ। যে জমি ‘উপহার’ হিসেবে মজিবুরকে দিয়ে রেখেছেন নুর হোসেন।

চিটাগাং রোডে বাস, ট্রাক, লেগুনাসহ সব ধরনের ছোট-বড় পরিবহন থেকে চাঁদা আদায় ও ছিনতাই, অপহরণ, খুনের অন্যতম সহযোগী সিদ্ধিরগঞ্জ আইলপাড়ার বাদশা মিয়ার ছেলে মতিউর রহমান মতি। ২০ মামলার এ আসামী নুরের অসংখ্য অপকর্মের সহযোগী। তার পরামর্শে ও নুর হোসেনের হুকুমে অনেক মানুষকে মারপিটসহ পঙ্গু-জখমের শিকার হতে হয়েছে। সম্প্রতি সিআইডি তার বাড়িতে অভিযান চালায়।

আবুল কালাম ওরফে হিটলার কালাম। নুরের ৪০ বছরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাসে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরি। সব ধরনের অপরাধে সিদ্ধহস্ত। সড়কে গাড়ি ডাকাতি, ছিনতাই, শিল্প কারখানা, জুটমিল, পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, ট্যাক্সবিহীন সিমেন্ট পারাপারে কমিশনসহ অবৈধ নানা কাজের পারদর্শী ও অবৈধ আয়ের পরামর্শদাতা। বদরুদ্দিন সুপার মার্কেটে অফিস করেন। প্রতিরাতেই নুরের সঙ্গে বসতো রুদ্ধদ্বার বৈঠকে। নুর হোসেনের নির্দেশ অনুযায়ী ঝাঁপিয়ে পড়েন অপরাধকর্মে। কালামের বাড়ি বরিশালে হলেও এখন তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের বাগমারার বাসিন্দা। ৭ অপহরণ ও খুনের পর আত্মগোপনে থাকলে ২ দিন ধরে সিদ্ধিরগঞ্জে।

ফরহাদ দেওয়ান। শিমরাইল উত্তরপাড়ার বাসিন্দা। অশ্ল¬ীল যাত্রার রিট দাখিলকারী। যার রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১ জুন থেকে প্রায় ১ বছর শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডে মেলা-জুয়ার আসর বসছে। অশ¬øীল নাচ আর প্রকাশ্যে জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। ফরহাদের এই মেলা-জুয়া থেকে প্রতিরাত গড়ে ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ আয় করেছে নুর হোসেন। শিমরাইল উত্তরপাড়ার লোকমান মেম্বার। নিত্যনতুন অবৈধ আয়ের সন্ধানদাতা। কোথায় কীভাবে আয় হবে তার স্থান-পাত্র চিহ্নিত এবং উপায়ের পথ বলে দেয়া। সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর কাছে যার পরিচিতি ‘তথ্য কালেকশনদাতা’ হিসেবে।

থানা আওয়ামী লীগের প্রচার ও দফতর সম্পাদক তাজিম বাবু। এক সময় জুটমিলে চাকরি করতেন। চতুর তাজিম বাবু অধিকাংশই কাজাই করতেন প্রমাণ ছাড়া। তিনি নুুরের সঙ্গে প্রকাশ্যে কম যেতেন।

মিজানুর রহমান মিজান সিদ্ধিরগঞ্জ কলাবাগ পশ্চিমের হাবিবুর রহমান হাবিবের ছেলে। মিছিল-মিটিং মারপিটের নেতৃত্বদাতা। কাকে কীভাবে মারতে হবে, ধরতে হবে তা চিহ্নিত করে নুর হোসেনের অনুমতি নিয়ে নির্যাতন করা। সে নৌপথের বালু, পাথরবাহী ট্রলার থেকে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে। তার নির্যাতনে সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুরের বাসিন্দা ও মুক্তিয়োদ্ধা প্রজন্ম কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ, শিমড়াইল গ্রামের বাসিন্দা ও চিটাগাং রোডের এ রহমান সুপার মার্কেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আইয়ুব আলী সুপার মার্কেটের মালিক আইয়ুব আলী মুন্সির ভাতিজা হাসান পারভেজ, সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুরের বিএনপি কর্মী রবিনহুড সালাউদ্দিন, শিমরাইল গ্রামের বাসিন্দা ও ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি ঈমান আলী পঙ্গু-জখম হয়ে মামলায় এলাকা ছাড়া হয়ে আছেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ কলাবাগ পূর্ব গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম হীরা। নুর হোসেনকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঠিকাদারি এবং নারায়ণগঞ্জ সাইলো থেকে সারাদেশে ক্যারিং হওয়া খাদ্য অধিদপ্তরের মালামাল বিক্রি ও চাঁদা আদায় নিয়ন্ত্রণ করেন। এই দুই খাত থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করে নুর হোসেন।

সড়ক ও জনপদ বিভাগ এবং সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে সার্বিক পরামর্শদাতা হাসমত আলী হাসু, বড় হযরত, ছোট হয়রত, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার টেন্ডার কে পাবে, কাকে দেয়া যেতে পারে, কারা বেশি টাকা কমিশন দেবে এসব পরামর্শ দিয়ে নুর হোসেনের অপরাধের সহায়তাকারী। ট্রাকস্ট্যান্ড, মাদক ব্যবসা, জুয়া পরিচালনা, ফুটপাথ থেকে শুরু করে অপহরণ, মারপিটসহ বড় অপরাধ ও চাঁদা আদায় করে নূরের অবৈধ আয়ের সহযোগী শাহজাহান, আরিফুল হক হাসান, কিলার সেলিম, আলী মাহমুদ, সানাউল¬াহ সানা, আন্তঃজেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন ভান্ডারী, রফিকুল ইসলাম রতন (সম্প্রতি গ্রেফতার)। সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিলের চুন ও রেন্ট-এ কার ব্যবসায়ীদের থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করতেন জামাল উদ্দিন জামাল।