ইউক্যালিপটাস গাছের বিপদ ও করণীয়

একটি উদ্বেগজনক খবর। সেটি হচ্ছে ‘ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ছে ইউক্যালিপটাস গাছ, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।’ জেলার কৃষকেরা না জেনে-বুঝেই ক্ষেতের আলে, ফাঁকাজমিতে, রাস্তার ধারে বিদেশী এ গাছের চারা রোপণ করছেন ব্যাপকভাবে। অথচ এ গাছটি পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। এটি পানিশোষক ও ভূগর্ভের পানির স্তর নীচে নামিয়ে দেয়। ইউক্যালিপটাস গাছ এর চারপাশে ১০ ফুট এলাকার পানি শুষে নেয় এবং আকাশে উড়িয়ে দেয়। ফলে মাটি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এমনকি জমির উর্বরতা কমে যায় বলে ফসল উৎপাদনও হ্রাস পায়। তাই পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা এ গাছটি রোপণ না করতে এবং যেগুলো লাগানো হয়েছে সেগুলো কেটে ফেলার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু সেদিকে বেখেয়াল মানুষের নজর নেই। প্রতিবছর এর চারা রোপণ করেই চলেছেন। শুধু ঠাকুরগাঁওয়েই নয়, দেশের অন্য অঞ্চলেও এ গাছ ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের অসচেতনতার জন্য।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, গাছটি দেখতে সুন্দর ও এর পাতা সবুজ হলেও ক্ষতিকর দিকটা মারাত্মক। এ গাছে পাখি সহজে বসে না। বাসাও বাঁধে না। এ গাছের আশপাশে অন্যগাছও জন্মাতে পারে না। এর রেণু ও ধূলিকণা মানুষের হাঁপানি রোগ সৃষ্টির সহায়ক। এ গাছের পাতা মাটিতে পড়বার পর সহজে পচে না। ফলে মাটি তার উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলে। ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কমল কুমার সরকার জানান, ইউক্যালিপটাসের মতো বিদেশী প্রজাতির গাছ রোপণের ভাবনাটা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এটি ম্যানগ্রোভ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

এটি অন্যান্য গাছের চেয়ে মাটি থেকে সার, পানি ও এর উর্বরা শক্তি শুষে নেয় খুব দ্রুত। অক্সিজেন শোষণ করে বেশি এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। অথচ অন্যান্য গাছ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন বাতাসে ছেড়ে দেয়। আর এ অক্সিজেন হচ্ছে মানুষসহ সকল জীবের প্রাণবায়ু। এ হিসেবে এ গাছটিকে জীবনবিনাশী হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। প্রফেসর মনোতোষ কুমার দে ইউক্যালিপটাস গাছকে ‘পানিখেকো’ বলে উল্লেখ করেছেন।

পানি হচ্ছে উদ্ভিদ, জীব-জন্তু তথা মানুষের জীবন। অর্থাৎ যে গাছটি পানিখেকো সেটিকে এক অর্থে মানুষখেকোও বলা চলে। তার মানে অন্যসব গাছপালা মানুষের বন্ধু হলেও ইউক্যালিপটাস তা নয়। অথচ ঠাকুরগাঁওয়ের একশ্রেণির কৃষক এ গাছটি নিজেদের অজান্তেই ক্ষেতের পাশে, জমির আলে, রাস্তার দু’ধারে রোপণ করে আত্মঘাতী কর্মকা-ে লিপ্ত হয়ে পড়েছেন।

শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকদেরই দোষ দেই কেন, মহানগরী ঢাকাসহ দেশের অনেক শহরেও উচ্চশিক্ষিত মানুষও এ গাছটি তাদের বাড়ি-ঘরের আশপাশে ও বাগানে রোপণ করে নিজেদের অজ্ঞাতেই পরিবেশ এবং জমির বারোটা বাজাতে বসেছেন।

যাইহোক, আর সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে ঠাকুরগাঁওসহ দেশের সর্বত্র ইউক্যালিপটাস গাছ ধ্বংসের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পদক্ষেপটা মনে হবে নিষ্ঠুর। কিন্তু উপায় নেই। এ গাছটিকে আপাতদৃষ্টিতে সবুজ ও সুন্দর মনে হলেও এর ক্ষতিকর দিকটা আমাদের অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

আমাদের পরিবেশ, কৃষিজমি এবং জীবনের জন্য অপরিহার্য পানি ও অক্সিজেন বিনাশী ইউক্যালিপটাসের ব্যাপকতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণকেও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে অবশ্যই।